খালিদ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ
ইনসাফ ফাউন্ডেশন শতাধিক নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে চমৎকার একটি আয়োজন করল। আয়োজনটি ছিল নারীর অধিকার প্রশ্নে, কিন্তু লিবারেল-আতেঁলরা ধরে নিয়েছে প্রশ্নটি সাম্যের। তাই কুট-ক্যাঁচাল আরম্ভ করছে যে, স্টেইজে নারী নেই কেন।
স্টেইজে নারীর উপস্থিতি থাকতে হবে এটি মুলত (formal ) ইকুয়ালিটির দাবি। ইনসাফ ফাউন্ডেশন ফরমাল ইকুয়ালিটির কথা বলেনি, বরং আলাপ করছে অধিকার (justice-based) প্রসঙ্গে। দৃশ্যত সমতার জন্য নারীর স্টেইজে বসা হয়তোবা জরুরি, বাট অধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গে এর ন্যূনতম সম্পর্ক নেই।
একজন নারীর শিক্ষা গ্রহণের অধিকার আছে, কিন্তু প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে সমান সংখ্যক ছেলে-মেয়েকে পাশাপাশি (ফ্রি-মিক্সিং) বসাতে হবে—এটি অধিকার বা ন্যায্যতা কোনটিই নয়, বরং ফরমাল ইকুয়ালিটির দাবি।
আয়োজনটি যেহেতু হুজুররা করেছে, কাজেই এর ভ্যালিডিটি নষ্ট করতে হবে। ফলতঃ স্টেইজে নারীর উপস্থিতির প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে, ইনভ্যালিড করবার জন্য।
সমতার পশ্চিমা প্যারাডাইমে সবকিছু সমান-সমান লাগবে, অথচ এই প্যারাডাইমের সাথেই আমাদের দ্বন্দ্ব। নামাজের মতো প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতেই নারী-পুরুষ পাশাপাশি বসতে পারে না, শরিয়ত অনুমোদন দেয়নি। সেখানে এসব আয়োজন তো নগন্য।
নারীর সাম্য প্রশ্নে লিবারেল আঁতেলদের খুশি করতে চান? তাহলে নামাজে পুরুষের ইমামতি নারীরে দিয়ে করান, নামাজে নারী-পুরুষরে সমান কাতারে দাঁড় করান, এর আগে আঁতেলদের মুখ বন্ধ করতে পারবেন না।
রাবির শিক্ষক আ. আ. মামুন মঞ্চের হুজুরদের ফটোর সঙ্গে কিছু শেয়ালের ফটো যুক্ত করেছে। শেয়াল যেমন মুরগীর অধিকার নিয়ে কথা বলে, মঞ্চের পুরুষরাও নাকি তেমনি। আ. মামুন সাহেবরা নারী-পুরুষকে এভাবেই শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্কের দিকে ঠেলে দেন। তারমানে, পুরুষরা নারীর স্বার্থ নিয়ে আলাপ করতে পারবে না।
মুলত, অন্যান্য ইডিওলজির মতো নারীবাদও শ্রেনীদ্বন্দের আদলে চর্চিত হচ্ছে। নারীবাদ প্রতিনিয়ত সংকট-সীমাবদ্ধতার যে সিলসিলা নির্মাণ করতেছে তা ‘নারী অধিকার’ না বরং ‘শ্রেণী-রাজনীতি’। Heywood বলেছেন, ‘Feminist thought’ can be broadly defined as the ideology of trying to advance the social role of women’
সাম্প্রতিক সময়ে জাপানে ফেমিনিষ্টরা রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে, পুরুষ প্রতিনিধির বিপরীতে নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে নারী-প্রার্থীদের।
ফলে আইনসভায় নারীদের উপস্থিতি বাড়ছে নাটকীয় হারে। ওয়েলশ (Welsh) এসেম্বলিতে ৫০% নারী আইনসভায় জায়গা করে নিয়েছে। অন্যান্য এসেম্বলিতেও বাড়ছে সংখ্যা। ফলে নারীবাদকে ‘নারী অধিকারের’ এজেন্ট ভাবলে ভুল করবেন। নারী অধিকার আর নারীবাদ এক জিনিস না। ফেমিনিজমের রয়েছে নিজস্ব আদর্শিক-রাজনৈতিক পরিচয়।
মনে রাখবেন, আমরা নারীর অধিকার বলতে বুঝি, নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা, উত্তরাধিকার, শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক ইত্যাদি অবস্থান নিশ্চিত করা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানে নারী-পুরুষকে প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়ার ব্যাপারে ইসলামের শক্ত দ্বিমত আছে। এটিই ফিতরাত, যার উপর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আমরা নারীর প্রাপ্য মর্যাদা, সুযোগ এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চাই, যা স্বয়ং আল্লাহ ঠিক করে দিয়েছেন।
নারী কেন নারীবাদকে অপছন্দ করে? ফেমিনিজম নারী অধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে থাকলে, নারী তো স্বাধিকার বিরোধী হতে পারে না। এন্টি-ফেমিনিজম কোন নতুন জিনিস না, গত শতকের সত্তরের দশকে marabel morgan এর ‘The total woman’ বইটি বেষ্টসেলার হয়েছিল।
কয়েক বছর আগেও পশ্চিমে ‘নারীবাদ বিরোধী প্ল্যাকার্ড’ নিয়ে সোসাল মিডিয়া উত্তাপ ছড়িয়েছিল নারীরা। তাদের প্ল্যাকার্ডে বিচিত্র বাক্য প্রদর্শিত হয়েছিল– “I don’t need feminism because I believe in equality not entitlement and supremacy । আবার কেউ লিখেছিল, I don’t need feminism because it reinforces the men as agent and women as victims dichotomy। বিশেষত, তারা নারীদের ঐতিহ্যিক প্রথার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তারা মনে করেন, মা হিসেবে ঘরে থাকার অধিকার ক্ষুন্ন করছে ফেমিনিজম, আমরা যথার্থ-মা হতে চাই; একটা সুস্থ পরিবার ও সমাজ গড়ে তুলবো।
৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে BBC news ‘why so many young women don’t call themselves feminist’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল Dr Christina scharff এর তৈরিকৃত। তিনি আশ্চর্য হয়ে বলেন, “‘So it’s perhaps unexpected that the identity ‘feminist’ has not gained more popularity among young women in the western world” পশ্চিমা সমাজে ফেমিনিজম এখনও যুবতী নারীদের আকর্ষণ করেনি, মুসলিম সমাজে এটি ঢের বেশি জটিল। ইত্যাদি কারণে নারীবাদ এবং নারী অধিকারকে আলাদা করেই দেখতে হবে।




