মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরাসরি আলাপ করেছেন এবং গাজার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ নীতির বিষয়ে তাকে “তার পথ পরিবর্তন” করার আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ফিলিস্তিনি ছিটমহল গাজার জনগণ বর্তমানে ‘ক্ষুধার্ত’, এবং তাদের খাদ্য সহায়তা এখন অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
স্কটল্যান্ডের টার্নপাইকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কায়ার স্টারমারের সঙ্গে বৈঠকের সময় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা গাজায় খাদ্য কেন্দ্র স্থাপনের জন্য কাজ করব, এবং আমরা অর্থ প্রদান করব, এবং অন্যান্য দেশ আমাদের সাথে যোগ দেবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গাজায় খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রগুলি কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই খোলা থাকবে,’ এবং জোর দিয়ে বলেন, ‘গাজায় প্রকৃত ক্ষুধা রয়েছে এবং আমরা অনেক জীবন বাঁচাতে পারি।’
ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দেন, ‘আমরা গাজার সকল বাধা অপসারণ করব এবং আমরা নিশ্চিত করব যে খাদ্য শিশুদের কাছে পৌঁছাবে,’ এই পরিস্থিতিকে তুলে ধরে বলেন, বাসিন্দারা এখন ‘মাইক্রো মাইল দূরে খাবার দেখতে পাচ্ছেন এবং তা পৌঁছাতে পারছেন না।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমরা গাজায় প্রচুর অর্থ দিয়েছি, এবং কেউ আপনাকে ধন্যবাদ জানায়নি।’ সেইসঙ্গে তিনি অন্যান্য দেশগুলোকেও তাদের অবদান বাড়াতে আহ্বান জানান।
খাদ্য সংকটে গাজা
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্র অনুযায়ী, ইসরাইলি অবরোধ এবং মার্কিন সমর্থিত সামরিক অভিযানের কারণে গাজায় দুর্ভিক্ষের মাত্রা অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে। চিকিৎসা সূত্র বলছে, অপুষ্টি ও পানিশূন্যতার কারণে মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্ভিক্ষে শহীদ হয়েছেন ১৪৭ জন, যাদের মধ্যে ৮৮ জনই শিশু।
মে মাসের শেষ দিক থেকে, গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন নামের একটি মার্কিন-ইসরাইলি প্রকল্প অবরুদ্ধ উপত্যকায় খাদ্য বিতরণের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে প্রতিস্থাপন করেছে, যারা এই প্রকল্পকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে—এটি একপ্রকার ফাঁদ, যা বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা ও বাস্তুচ্যুত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কায়ার স্টারমার বলেন, ‘গাজায় ক্ষুধার্ত শিশুদের চিত্র ভয়াবহ।’ তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘একটি মানবিক সংকট এবং সকল মানদণ্ডে একটি বিপর্যয়’ বলে আখ্যায়িত করেন। ব্রিটেনের জনগণও স্ক্রিনে যা দেখছে তাতে ক্ষুব্ধ বলে জানান তিনি। স্টারমার যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, ‘গাজায় যুদ্ধবিরতি অর্জনের জন্য আমাদের অন্যান্য দেশকে একত্রিত করতে হবে।’
নেতানিয়াহুকে পরিকল্পনার প্রস্তাব
ট্রাম্প জানান, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার আলাপে ‘গাজার জন্য পরিকল্পনা’ নিয়ে কাজ চলছে, যদিও বিস্তারিত কিছু জানাননি। তিনি রবিবার বলেন, ‘আমি বিবি (নেতানিয়াহু) কে বলেছি হয়তো তাকে তার পথ পরিবর্তন করতে হবে।’
তাঁর মতে, ইসরাইল ‘গাজায় সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি মহান দায়িত্ব বহন করে এবং অনেক কিছু করতে সক্ষম।’
যুদ্ধবিরতি সম্ভব কিনা—এ প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ। যুদ্ধবিরতি সম্ভব, কিন্তু আমাদের তা করতে হবে।’
হামাস ও যুদ্ধের বাস্তবতা
ট্রাম্প ইসলামিক প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের সমালোচনা করে বলেন, তাদের মোকাবিলা ‘কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ তারা অবশিষ্ট জিম্মিদের ছেড়ে দিতে চায় না।’ তিনি জানান, ‘আমরা মাঝে মাঝে জানি গাজায় জিম্মিরা কোথায় আছে, কিন্তু আমরা তাদের হত্যার ভয়ে আক্রমণ চালাতে চাই না।’
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইল, মার্কিন সহায়তায়, গাজার ওপর নির্মূল যুদ্ধ শুরু করে। ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৬০,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ১,৪৫,০০০-এরও বেশি, এবং পুরো গাজা উপত্যকার জনসংখ্যা কার্যত বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
সূত্র : আল জাজিরা




