নেতানিয়াহু, পশ্চিমা মিত্র, মধ্যপ্রাচ্য, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়া, অ্যান্থনি আলবানিজ

নেতানিয়াহু ও পশ্চিমা মিত্রদের সম্পর্কের নতুন টানাপোড়েন

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্রমেই এমন এক রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রবেশ করছেন, যেখানে আঞ্চলিক সংঘাতকে তিনি বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে টেনে আনছেন। মধ্যপ্রাচ্যকে রূপান্তরিত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে এগোনো এই ডানপন্থী নেতা এখন নিজের যুদ্ধকে এক ধরনের বিশ্বজনীন লড়াই হিসেবে তুলে ধরছেন। এর প্রভাব এতটাই ব্যাপক যে তিনি ঐতিহাসিক পশ্চিমা মিত্রদের সাথেও প্রকাশ্যে সঙ্ঘাতে জড়াতে দ্বিধা করছেন না—যাদের সহায়তায় ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও শক্তিশালী হয়েছিল।

পশ্চিমা মিত্রদের সাথে প্রকাশ্য বিরোধ

গাজায় যুদ্ধ বন্ধ ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্নে ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক তীব্র সঙ্কটে পড়েছে।

ফ্রান্সে নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ‘হামাস সন্ত্রাসবাদ’-এর মুখে ইহুদি বিদ্বেষ উস্কে দিচ্ছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্টের দফতর এ মন্তব্যকে ‘নিষ্ঠ’ ও ‘ভ্রান্তির উপর ভিত্তি করে’ আখ্যা দিয়ে গাজা যুদ্ধ ও বসতি নীতির বিরোধিতা প্রকাশ করে।

নিউজিল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুক্সন সরাসরি নেতানিয়াহুর নীতিকে ‘মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’ অবস্থার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেন।

অস্ট্রেলিয়ায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতির পক্ষে অবস্থান নেয়ায় নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে অভিহিত করেন। জবাবে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শক্তি নির্ধারিত হয় না কতজনকে আপনি উড়িয়ে দেন বা অনাহারে রাখেন তার দ্বারা।’

ঐতিহাসিক পটভূমি

পশ্চিমা-ইসরাইলি জোটের শিকড় খুঁজতে গেলে কয়েকটি পর্যায় গুরুত্বপূর্ণ-

প্রতিষ্ঠাকাল (১৯৪৮-১৯৬৭) : হলোকাস্ট-পরবর্তী আবেগীয় প্রেক্ষাপটে ইউরোপ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়; যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার কয়েক মিনিট পরেই ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৬৭ সালের যুদ্ধ : ইসরাইলের দ্রুত বিজয় তাকে আঞ্চলিক সামরিক শক্তিতে পরিণত করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক গভীর করে।

পরবর্তী সময় : শান্তি প্রক্রিয়ার চেষ্টা চললেও সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত থাকে। ইউরোপ দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে সমর্থন করলেও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করেছে।

জোট টিকিয়ে রাখার কৌশল

ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে নানা উপায়ে পশ্চিমা মিত্রতার নেটওয়ার্ক বজায় রেখেছে-

যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা বিনিময়,
সঙ্ঘাতকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে উপস্থাপন, বিশেষত ৯/১১-এর পর ফিলিস্তিনি সংগ্রামকে ‘ইসলামী চরমপন্থা’ হিসেবে চিত্রিত করা,
সমালোচনাকে ‘ইহুদি বিদ্বেষ’ হিসেবে আখ্যা দেয়া,
এআইপ্যাকের মতো শক্তিশালী লবি গোষ্ঠীর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার।

নতুন বাস্তবতা

২০২৩-২০২৫ সালের গাজা যুদ্ধ এই সম্পর্কের কাঠামোতে নতুন ফাটল সৃষ্টি করেছে।

গণহত্যা, অনাহার ও ধ্বংসের চিত্র পশ্চিমা দেশগুলির অভ্যন্তরীণ জনমতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বহু বছর পর পশ্চিমা রাজধানীতে লাখ লাখ মানুষ ফিলিস্তিনের সমর্থনে রাস্তায় নেমেছে।

নতুন প্রজন্মের নেতা—ম্যাক্রোঁ, আলবানিজ, লুক্সন—হলোকাস্ট-পরবর্তী আবেগীয় উত্তরাধিকার বহন করেন না। তাদের কাছে জাতীয় স্বার্থ ও নৈতিক বৈধতাই অগ্রাধিকার।

নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক ভাষা ও প্রতিটি সমালোচনাকে ‘ইহুদি বিদ্বেষ’ বলে আখ্যা দেয়ার কৌশল কার্যকারিতা হারিয়েছে। এখন তা ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উত্তেজনার পাঁচটি কারণ

১. গাজা যুদ্ধের ভয়াবহতা ও পশ্চিমা জনমতের পরিবর্তন।
২. সমালোচনা প্রত্যাখ্যান ও ‘ইহুদি বিদ্বেষ’ অভিযোগের অকার্যকারিতা।
৩. ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রতীকী প্রয়োজনীয়তা।
৪. নেতানিয়াহুর ব্যক্তিত্ব ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ।
৫. পশ্চিমা শিবিরের বিভাজন—যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন দৃঢ় সমর্থক হলেও ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ইসরাইলকে এখন নৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখছে।

জোট কি ভাঙছে?

সম্পূর্ণ ভাঙন নয়, তবে সম্পর্কের চরিত্র বদলাচ্ছে।

সামরিক সহযোগিতা : যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও জার্মানির সঙ্গে অটুট।
রাজনৈতিক মাত্রা : ইউরোপে অস্থিরতা ও দ্বিধা।
নৈতিক অবস্থান : গাজা যুদ্ধ ইসরাইলকে দুর্বল করেছে।
অর্থনৈতিক মাত্রা : বয়কট ও অস্ত্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের দাবি উঠছে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

১. ধাপে ধাপে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি।
২. সামরিক সহযোগিতা থাকলেও নিঃশর্ত রাজনৈতিক সমর্থন কমে যাওয়া।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে কম চরমপন্থী নেতৃত্বে পরিবর্তনের সম্ভাবনা।
৪. ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও স্পেনের মতো দেশের কূটনৈতিক ব্লক গঠন।

বর্তমান টানাপোড়েন ইসরাইল-পশ্চিমা জোটের সমাপ্তি নয়, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর। একসময়ের নিঃশর্ত সহযোগীরা এখন সমালোচনামূলক মিত্রে পরিণত হয়েছে। গাজার যুদ্ধ এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, আর নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক কৌশল ভবিষ্যতে পশ্চিমা-ইসরাইলি সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করছে।

সূত্র : আল জাজিরা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top