রেদওয়ান হাসান
থিউরিস্টদের মতে, আধিপত্য কেবল জোর করে নয়, বরং সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও ‘নৈতিক নেতৃত্ব’ দিয়েও প্রতিষ্ঠা করা যায়। পশ্চিমা বিশ্ব যখন কাউকে ‘শান্তির প্রতীক’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়, তখন সেই ব্যক্তি নিজ দেশে এক ধরনের ‘নৈতিক নেতৃত্বের’ অধিকারী হয়ে ওঠেন। যেখানে জনগণ ধরে নেয়, এই নেতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং গ্রহণযোগ্য। ফলে অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।
নোবেল শান্তি পুরস্কার হচ্ছে এই হেজেমনিক নৈতিকতাকে প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘সফট পাওয়ার’ টুল। নোবেল শান্তি পুরস্কার আধুনিক বিশ্বে অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হলেও এর ব্যবহার ও প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এর প্রয়োগ অনেক সময় নিরপেক্ষ সম্মাননা না হয়ে একটি সুপরিকল্পিত নেতৃত্ব নির্মাণ কৌশলের অংশ হয়ে ওঠে। নোবেল শান্তি পুরস্কার একটি কৌশলগত হাতিয়ার। এর মাধ্যমে পশ্চিমা শক্তিগুলো বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের বীজ রোপণ করে এবং পরবর্তীতে ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য’ নেতৃত্ব তৈরি করে।
দেখুন, ২০০৫ সালে মিশরীয় বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ আল-বারাদেয়িকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। তার কাজ ছিল ইরাক যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশনে নেতৃত্ব দিয়ে যুদ্ধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখা। কিন্তু এই পুরস্কারের কিছুদিন পরই তিনি মিশরের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেন। ২০১১ সালের বিপ্লবের পর তিনি হয়ে ওঠেন সেক্যুলার ও উদারপন্থী দলগুলোর প্রধান মুখ। যদিও প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী না হয়ে তিনি সরে দাঁড়ান, তবে ২০১৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এরপর সেনা সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন এবং নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও সামরিক সরকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু শেষমেশ তাকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়, যেখানে তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা, পশ্চিমা এজেন্ডা প্রভৃতি অভিযোগ উত্থাপিত হয়।
এমন দৃষ্টান্ত একমাত্র আল-বারাদেয়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৬ সালে বাংলাদেশে শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখা হলেও নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে তার ব্যক্তিত্বকে একটি রাজনৈতিক প্রতিমূর্তি হিসেবে দাঁড় করানো হয়। ২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত সরকারের সময় তাকে রাজনীতিতে আনার সক্রিয় উদ্যোগ দেখা যায়। পরবর্তীতে ইউনূস নিজেই ‘নাগরিক শক্তি’ নামে একটি রাজনৈতিক উদ্যোগের ঘোষণা দেন, যদিও তা সফল হয়নি। তবে এটা পরিষ্কার যে, নোবেল পুরস্কার তার রাজনৈতিক অবস্থানকে ‘আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য’ ও ‘ভবিষ্যত নেতৃত্বের যোগ্য’ হিসেবে চিত্রিত করেছিল। পাকিস্তানে মালালা ইউসুফ জাইকে দিয়েও পশ্চিমা হেজেমনিক ধারণা অনেকটা একই রকম।
এই প্রক্রিয়াগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, নোবেল শান্তি পুরস্কার অনেক সময় পশ্চিমা সফট পাওয়ার প্রয়োগের অংশ হিসেবে কাজ করে। পলিটিক্যাল হেজেমোনি ধারণা অনুসারে কোনো ব্যক্তিকে আন্তর্জাতিক নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে জনগণের মধ্যে এক ধরনের আত্মিক সম্মতি তৈরি করা হয়, যেটা সশস্ত্র জোর বা রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ ছাড়াই কার্যকর হয়। এই নেতাদের দিয়ে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটাতে আগ্রহী হয় আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো। এভাবেই তারা একটি জাতির আত্মিক ভূমি দখল করে ফেলে, শারীরিক আগ্রাসন ছাড়াই।
আবার পোস্ট-কলোনিয়াল থিওরির আলোকে বিশ্লেষণ করলে এটা আরও স্পষ্ট হয় যে, উপনিবেশোত্তর সময়েও পশ্চিমা বিশ্ব বিভিন্ন অঞ্চলে মধ্যস্থতাকারী শ্রেণি তৈরি করে রেখেছে, যারা নিজেদের দেশের লোক হলেও মূলত পশ্চিমা বিশ্ব বা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্বার্থ রক্ষা করে। এই শ্রেণির উৎপাদন ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরির একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে নোবেল শান্তি পুরস্কার।
তবে বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন বার্তা দেয়। আল-বারাদেয়ির মতো বিশ্বে গ্রহণযোগ্য নেতা নিজ দেশে হয়ে ওঠেন বিতর্কিত, কারণ তার পেছনে থাকে জনগণের নয়, বরং বাইরের শক্তির মদদ। ড. ইউনূসের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, দেশের বাস্তব রাজনীতিতে নেমে একপ্রকার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। কারণ, জনগণ তাদের মধ্যে তাদের সমস্যার বাস্তব সমাধান খুঁজে পায়নি।
সুতরাং প্রশ্ন এখন এটা নয় যে, কাকে শান্তি পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে; বরং আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, কেন দেওয়া হচ্ছে, কারা দিচ্ছে এবং তার পেছনে কাদের স্বার্থ নিহিত?
এভাবে যদি নোবেল শান্তি পুরস্কারকে কেবল একটি মর্যাদাপূর্ণ পদক হিসেবে না দেখে একটি পলিটিকাল ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে বোঝা যাবে, বিশ্বব্যবস্থায় নেতৃত্ব শুধু উৎপন্ন হয় না, বরং তৈরি করা হয়। নোবেল শান্তি পুরস্কার অনেক সময় সত্যিকারের শান্তির প্রতীককে সম্মানিত করলেও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি একটি ‘পলিটিকাল ইনভেস্টমেন্ট’ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
যখন কোনো দেশে সরকার পরিবর্তনের সূচনা হয়, কিংবা জাতিকে ‘আধুনিকতা ও উন্নয়ন’ নামে তাদের নিজস্ব শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াস শুরু হয়, তখন এসব পুরস্কার সেই প্রক্রিয়ার বৈধতা তৈরির প্রথম ধাপ।
এমন প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রয়োজন নিজস্ব রাজনৈতিক সচেতনতা এবং যেকোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিতে দেখা। কেবল অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং প্রশ্নের মাধ্যমে যাচাই করা। জনতার স্বার্থেই নেতৃত্ব তৈরি হওয়া জরুরি, আন্তর্জাতিক শক্তির স্বার্থে নয়।




