পিআর ব্যবস্থা,

পিআর পদ্ধতি নিয়ে আলোচিত প্রশ্ন ও তার সমাধান

বাংলাদেশে জনমিতিক বিভাজন তুলনামূলকভাবে কম এবং জনগণ ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস করেন। এই সামাজিক ও ভৌগোলিক ঐক্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) নির্বাচনী ব্যবস্থা চালুর জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি। জুলাই বিপ্লবের পর দেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দাবি উত্থাপিত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে মিশ্র-সদস্য আনুপাতিক (MMP) নির্বাচন ব্যবস্থা একদলীয় কর্তৃত্ববাদ, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও গণতন্ত্রহীনতার দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে উত্তরণের একটি কাঠামোগত সংস্কার হতে পারে।

কাঠামো

মোট আসন : ৩০০ (নির্ধারিত)
FPTP আসন : ১৫০ (সরাসরি ভোটে নির্বাচিত)
PR আসন : ১৫০ (ক্লোজড-লিস্ট পদ্ধতিতে দলীয় ভোটের ভিত্তিতে বণ্টিত)
দেশের ৮ বিভাগ ও ৬৪ জেলার জনসংখ্যা ও ভোটারের ভিত্তিতে FPTP আসন ভাগ হবে।
সীমানা নির্ধারণ করবে স্বাধীন কমিশন, যেখানে স্বচ্ছতা ও গণশুনানির ব্যবস্থা থাকবে।

পিআর পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক ও পাল্টা যুক্তি

১. দুর্বল ও অস্থিতিশীল সরকার হওয়ার আশঙ্কা

সমালোচকরা বলেন, পিআরে একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন না করায় জোট সরকার অস্থিতিশীল হয় এবং নীতিনির্ধারণ বিলম্বিত হয়।

পক্ষে যুক্তি: জোট সরকার আসলে সহনশীল ও আলোচনাভিত্তিক হয়। নীতিনির্ধারণে সমঝোতা তৈরি হয়, যা অধিক টেকসই। জার্মানি, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস পিআর পদ্ধতিতে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি বজায় রেখেছে।

২. ভোটার-এমপি সম্পর্কের অভাব

সমালোচনা হলো, দলীয় তালিকা থেকে নির্বাচিত এমপি স্থানীয় দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যেতে পারেন।

পক্ষে যুক্তি: MMP ব্যবস্থায় ভোটাররা দুটি ভোট দেন—একটি স্থানীয় প্রার্থীকে (FPTP), একটি দলকে (PR)। এতে স্থানীয় সম্পর্কও বজায় থাকে এবং জাতীয়ভাবে ন্যায্য প্রতিনিধিত্বও নিশ্চিত হয়। জার্মানি ও নিউজিল্যান্ড এ পদ্ধতিতে সফল।

৩. দলীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রীকরণ

সমালোচনা হলো, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তালিকা বানালে তৃণমূল অবহেলিত হয় ও স্বজনপ্রীতি বাড়ে।

পক্ষে যুক্তি: দলীয় গণতন্ত্র, অভ্যন্তরীণ প্রাইমারি, সদস্যভিত্তিক ভোট, জেন্ডার/অঞ্চল কোটা প্রবর্তনের মাধ্যমে তালিকা গণতান্ত্রিক করা সম্ভব। সুইডেন, ফিনল্যান্ড, জার্মানিতে এ ধরনের প্রক্রিয়া চালু রয়েছে।

৪. চরমপন্থী দলের প্রবেশাধিকার

সমালোচকরা মনে করেন, অল্প ভোট পেলেও উগ্র বা বিভাজনকারী দল সংসদে প্রবেশ করতে পারে।

পক্ষে যুক্তি: অন্তর্ভুক্তি ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই তাদের মূলধারায় আনা যায়। ন্যূনতম ভোটসীমা (threshold) ২–৫% নির্ধারণ করলে বিভাজন রোধ হয়। জার্মানিতে ৫% সীমা কার্যকর উদাহরণ। সংসদে প্রবেশ করলে এ দলগুলো বিতর্ক ও জবাবদিহির মধ্যে পড়ে, যা তাদের দায়িত্বশীল করে।

৫. রাজনৈতিক দরকষাকষি ও ব্ল্যাকমেইলিং

আশঙ্কা থাকে, ছোট দলগুলো জোট সরকারে ‘কিং-মেকার’ হয়ে ব্ল্যাকমেইল করতে পারে।

পক্ষে যুক্তি: দরকষাকষি গণতন্ত্রের অংশ, যা একনায়কতন্ত্র ঠেকায়। সঠিক আইন ও সংস্কৃতি থাকলে জোট সরকার সুশাসনের মডেল হতে পারে। জার্মানি, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস নিয়মিত জোট সরকার পরিচালনা করেও স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে।

৬. স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সুযোগ সীমিত

সমালোচনা হলো, পিআরে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জায়গা নেই।

পক্ষে যুক্তি: MMP-তে তারা সরাসরি FPTP আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। জনপ্রিয় হলে সংসদে প্রবেশ সম্ভব। তারা প্ল্যাটফর্ম বা জোট গঠন করেও পিআরে অংশ নিতে পারেন।

বাস্তবায়নের পথ

প্রথমত: জুলাই সংস্কার সনদের মাধ্যমে সংসদে দ্বি-কক্ষীয় কাঠামো প্রবর্তন করে উভয় কক্ষে MMP কার্যকর করা। এর জন্য রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ বা বিচার বিভাগের আইনগত প্রক্রিয়া ব্যবহার করে বৈধতা দেয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত: রাজনৈতিক ঐক্য না হলে গণভোট আয়োজন করে জনগণের ম্যান্ডেট নেয়া।

বাংলাদেশ বর্তমানে গভীর গণতান্ত্রিক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। আওয়ামী লীগ বিতাড়িত হওয়ার পর একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। যদি MMP সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হয়, তবে দেশ আবারও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হবে। তাই আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগেই MMP পদ্ধতি বাস্তবায়ন অপরিহার্য, যা ন্যায়, স্থিতিশীলতা, দায়বদ্ধতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top