মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ নিয়ে তার অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ১৪ জুলাই এক ঘোষণায় তিনি জানান, ইউক্রেনের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অতিরিক্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার। বর্তমানে ইউক্রেনের শহরগুলো প্রতিদিন ১০০টিরও বেশি রাশিয়ান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস থেকে ফাঁস হওয়া এক তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প সম্প্রতি এক ফোনালাপে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মস্কোতে সরাসরি আঘাত হানতে কিয়েভের কী ধরনের আক্রমণাত্মক অস্ত্র দরকার।
ট্রাম্প আরো জানান, আগামী ৫০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যদি রাশিয়া যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হয়, তাহলে যারা রাশিয়ান তেল কিনবে তাদের উপর ১০০ শতাংশ সেকেন্ডারি শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে তার প্রশাসনের।
তবে এই কঠোর বার্তাসত্ত্বেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক কোনো বাস্তব পরিবর্তন দেখা যায়নি। রাশিয়ান কর্মকর্তারা ট্রাম্পের বক্তব্যকে উপহাস করেছেন এবং সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে পরিমাণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ট্রাম্প পাঠানোর কথা বলেছেন, তা সরবরাহ করতে বহু মাস সময় লাগবে।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে শুল্কের হুমকি জ্বালানি বাজারেও কোনো বড় প্রভাব ফেলেনি।
ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে জটিল। যদিও ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে পুতিনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, কিন্তু কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি রাশিয়ার সাথে সঙ্ঘাতে রয়েছেন। ট্রাম্প চান আমেরিকান গ্যাস রফতানি বাড়াতে। আর পুতিন বিকল্প বাজারের ওপর নির্ভর করে ইউরোপীয় গ্যাস বাজারে প্রভাব বজায় রাখতে চান। গ্রিনল্যান্ড ও মেরু রুটের ওপর দুই নেতার স্বার্থও পরস্পরবিরোধী। তদুপরি উভয়েই ইউক্রেনের খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ চায়।
ট্রাম্প এর আগে যুদ্ধ একদিনে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা পরে তিনি নিজেই অতিরঞ্জিত বলে স্বীকার করেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সাথে তার অতীত বৈরিতা কিছুটা কমে এসেছে কিয়েভ ওয়াশিংটনের মধ্যে খনিজ সম্পদসংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব চুক্তির পর।
সম্প্রতি ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন, পুতিন প্রকৃতপক্ষে শান্তি আলোচনায় আগ্রহী নন। মে ও জুনে কিয়েভ-মস্কো শান্তি আলোচনা ছিল মূলত প্রতীকী। যার লক্ষ্য ছিল ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করা। আলোচনার সময় পুতিন দাবি তোলেন দক্ষিণ ও পূর্ব ইউক্রেনের কিছু অঞ্চল এবং উত্তর ইউক্রেনে একটি বাফার জোনের নিয়ন্ত্রণের।
তবে ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে-
১. রাশিয়ান তেলের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে তেলের দাম বৃদ্ধির বিরোধিতা করেছেন এবং জুনে ইরানে হামলার পর তেলের দামের ঊর্ধ্বগতিরও তিনি সমালোচনা করেন।
২. অতীতে সেকেন্ডারি শুল্ক কার্যকর হয়নি। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও এমন হুমকি অস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু বেইজিং পরে ক্রয় বাড়িয়ে আবার বাজারে ফিরেছিল।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধের মধ্যে বেইজিং ট্রাম্পের হুমকি আমলে নেবে, এমন সম্ভাবনাও কম। তদুপরি ৩ সেপ্টেম্বরের সময়সীমা ট্রাম্প নির্ধারণ করায় সিনেটের নিষেধাজ্ঞা বিলের গ্রহণযোগ্যতাও জটিল হয়ে উঠতে পারে। যদিও সিনেটের ৮৩ সদস্য বিলটির সহ-পৃষ্ঠপোষক, রিপাবলিকান নেতৃত্ব ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করতে চাইছে না। কারণ তিনি দলের নীতির ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন।
ট্রাম্প ইউরোপীয়দের স্বীকার করতে বাধ্য করেছেন যে ইউক্রেনকে সমর্থন ব্যয়বহুল। তবে তার দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর আগেই ইউরোপীয় সমর্থন পরিমাণগতভাবে মার্কিন সমর্থনকে ছাড়িয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও, ইউক্রেনের জন্য মার্কিন অস্ত্র ও প্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিহার্য, যদিও সেগুলোর কার্যকর ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ ও সময় প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনকে কেবল অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে আলোচনায় বাধ্য করা সম্ভব নয়; একটি বহুপাক্ষিক কৌশল দরকার, যা ট্রাম্পের মিত্রদের সাথে দ্বন্দ্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা ওয়াশিংটনের জন্য কঠিন।
যদিও ভারতের জ্বালানিমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি স্পষ্ট করেছেন যে নয়াদিল্লি তার রাশিয়ান তেল নীতি বদলাবে না। তবে ভবিষ্যতে কড়াকড়ি এই অবস্থানে পরিবর্তন আনতে পারে। পূর্ণ-স্কেল যুদ্ধের আগে রাশিয়ার তেলের প্রান্তিক ক্রেতা ভারত এখন ৪০ শতাংশ আমদানি করে রাশিয়া থেকেই, যা তাকে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজারে পরিণত করেছে।
মূলকথা হলো, ট্রাম্পের হুমকি এবং ঘোষণাগুলো যুদ্ধের গতিপথে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেনি। বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও কূটনৈতিক সমীকরণে ট্রাম্পের কৌশল সীমাবদ্ধতা ও দ্বিধার মুখোমুখি। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ই জানে যে মার্কিন নেতৃত্ব ছাড়া যুদ্ধের সমাপ্তি অসম্ভব। কিন্তু সেই নেতৃত্ব কেমন হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
সূত্র : আল জাজিরা




