গাজা, নেতানিয়াহু, গাজা উপত্যকা, ইসরাইল

পুরো গাজা দখলে যে পরিকল্পনা হাতে নিলো নেতানিয়াহু

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দখলদার সেনাবাহিনীর ২২ মাসের গণহত্যামূলক যুদ্ধের পর—যার মধ্যে রয়েছে নৃশংস বোমাবর্ষণ, হাজারো মানুষের মৃত্যু, লক্ষাধিক আহত ও বাস্তুচ্যুত হওয়া এবং পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ যা তার নৃশংসতম পর্যায়ে পৌঁছেছে—মনে হচ্ছে ইসরাইলের রক্তপিপাসা এখনও থামেনি।

৮ আগস্ট শুক্রবার ভোরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওয়ান্টেড তালিকাভুক্ত ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাজা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এটি সমগ্র গাজা উপত্যকা দখলের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

এই পরিকল্পনায় প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনিকে দক্ষিণে পালিয়ে যেতে বাধ্য করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত, যা উপত্যকার মানবিক বিপর্যয়কে আরও তীব্র করার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

ইসরাইলি কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক ঘোষণায় জানানো হয়, নতুন পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা, গাজায় এর সামরিক ও প্রশাসনিক প্রভাব শেষ করা, বন্দীদের উদ্ধার, উপত্যকার ভেতরে একটি বাফার জোন তৈরি, নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ আরও কড়া করা এবং হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বাইরে একটি নতুন স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গাজার যে এলাকাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি—যা মোট উপত্যকার প্রায় ২৫%—সেখানে স্থলবাহিনী মোতায়েন করা হবে।

টাইমস অব ইসরাইলের তথ্যানুযায়ী, এই বৃহৎ আক্রমণ পরিকল্পনায় অন্তত চার থেকে পাঁচটি ইসরাইলি সেনা ডিভিশন অংশ নেবে। এসব ডিভিশন স্থায়ী ব্রিগেড ও সংগঠিত রিজার্ভ বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত, যার মধ্যে রয়েছে অভিজাত পদাতিক ও সাঁজোয়া ইউনিট। সম্প্রসারিত অভিযানকে সহায়তা করতে কয়েক হাজার রিজার্ভিস্টকে ডাকা হয়েছে এবং সেনাবাহিনীর দক্ষিণ কমান্ডে সক্রিয় কর্তব্যরত সৈন্যের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।

প্রত্যাশিত অংশগ্রহণকারী ইউনিটগুলোর মধ্যে রয়েছে গোলানি ও গিভাতি ব্রিগেড—উভয়ই পদাতিক ইউনিট—শহুরে যুদ্ধে প্রশিক্ষিত প্যারাট্রুপার ব্রিগেড, মেরকাভা ট্যাঙ্কসমৃদ্ধ সাঁজোয়া ব্রিগেড (যেমন ৪০১তম আর্মার্ড ব্রিগেড, যারা পূর্বে গাজার ভেতরে লড়াই করেছে) এবং দুর্গ ভাঙা ও সুড়ঙ্গ ধ্বংসে বিশেষজ্ঞ যুদ্ধ প্রকৌশল ইউনিট।

ব্রিগেডের এই পরিসর ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য এই অভিযানে অংশ নেবে এবং অভিযান অন্তত কয়েক মাস ধরে চলতে পারে।

এছাড়াও, কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান (F-16 ও F-35 সহ) এবং আক্রমণকারী হেলিকপ্টার (AH-64 অ্যাপাচি) দখলদারদের দাবি অনুযায়ী অস্ত্রভাণ্ডার, সুড়ঙ্গ প্রবেশপথ এবং ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ঘনিষ্ঠ বিমান সহায়তা দেবে (যদিও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহতদের বেশিরভাগই নারী ও শিশুসহ বেসামরিক নাগরিক)।

আইডিএফ অসংখ্য ড্রোন মোতায়েন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে—যার মধ্যে নজরদারি বিমান থেকে শুরু করে ছোট কৌশলগত কোয়াডকপ্টার পর্যন্ত থাকবে—যা ভবন ও যুদ্ধক্ষেত্রে টহল ও পর্যবেক্ষণ চালাবে।

এই ড্রোন বহর ক্রমাগত গোয়েন্দা নজরদারি সরবরাহ করবে এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকায় দ্রুত আক্রমণ চালাতে পারবে, যেখানে প্রচলিত বিমান ব্যবহার কঠিন।

সম্মুখযুদ্ধ বাহিনীর পেছনে অবস্থান করবে আর্টিলারি ব্যাটারি (১৫৫ মিমি হাউইটজার ও গাইডেড মিসাইল), যা প্রয়োজনে অগ্নিসহায়তা দেবে; যুদ্ধ চলাকালে নিক্ষিপ্ত যেকোনো রকেট প্রতিহত করতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (আয়রন ডোম ও ডেভিড’স স্লিং ব্যাটারি); গাজায় জ্বালানি, গোলাবারুদ, পানি ও সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য লজিস্টিক ইউনিট; এবং সম্মুখসারির আহতদের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা ইউনিট (ক্ষেত্র হাসপাতাল ও উচ্ছেদ দল)।

৪টি পর্যায়

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, এই অভিযান অন্তত ৪-৫ মাস স্থায়ী হবে এবং তা হবে একাধিক ধাপে বিভক্ত। প্রাথমিকভাবে উত্তর ও মধ্য গাজায় অভিযান চালানো হবে, এরপর তা বাকি এলাকায় সম্প্রসারিত হবে।

প্রথম পর্যায়ে, গাজা শহরের প্রায় ১০ লাখ বাসিন্দাকে উচ্ছেদের নোটিশ দিয়ে সরিয়ে নেওয়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইসরাইল দাবি করছে যে, তারা মধ্য ও দক্ষিণ গাজায় “মানবিক” নিরাপদ অঞ্চল গঠন করবে, যার মধ্যে ১৬টি সাহায্য বিতরণ কেন্দ্র থাকবে।

তবে বাস্তবে এসব প্রতিশ্রুতি অনাহার অভিযানের নতুন রূপমাত্র। এই ধাপে পানি, খাদ্য ও ওষুধের প্রবাহ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে দ্বিতীয় ও আরও রক্তাক্ত পর্যায়ের প্রস্তুতি নেওয়া হবে, যা এক ধরনের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প পরিস্থিতি তৈরি করবে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে, ঘনবসতিপূর্ণ গাজা সিটি ও পার্শ্ববর্তী শরণার্থী শিবিরে ব্যাপক স্থল আক্রমণ চালানো হবে। ইসরাইলি ব্রিগেডগুলো বিভিন্ন দিক থেকে শহরে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে ঘেরাও ও অবরোধ কৌশল প্রয়োগ করে গাজা সিটিকে বিচ্ছিন্ন করা হবে এবং কয়েক মাস ধরে অবরোধ জারি থাকবে। শহরের ভেতরে চলবে ব্যাপক অনুসন্ধান ও চিরুনি অভিযান, যা কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে।

তৃতীয় পর্যায়ে, গাজা সিটি পুরোপুরি দখলে আসার পর মধ্য ও দক্ষিণ গাজায় অভিযান সম্প্রসারিত হবে। প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু হবে নুসাইরাত ও বুরেজের মতো শরণার্থী শিবির এবং সালাহ আল-দিন সড়কের আশপাশের নগর এলাকা। এ পর্যায় শেষে উত্তর ও মধ্য গাজার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইসরাইলের হাতে যাবে এবং এলাকাগুলোকে পৃথক অঞ্চলে ভাগ করে ঘেরাও করে ফেলা হবে।

চতুর্থ পর্যায়ে, দখলকৃত এলাকায় নিরাপত্তা বজায় রাখা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হবে। গাজা জুড়ে পর্যাপ্ত বাহিনী ও নজরদারি সরঞ্জাম মোতায়েন করা হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে দখল ধরে রাখা যায়। এ সময় হামাসকে নিরস্ত্র করা, বন্দীদের ফিরিয়ে আনা, গাজা উপত্যকার সম্পূর্ণ সামরিকীকরণ, নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বাইরে একটি বিকল্প বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা চলবে।

“প্রত্যাশিত” হলেও আশ্চর্যের বিষয়, ইসরাইল শুরু থেকেই এই লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা লক্ষাধিক বেসামরিক নাগরিককে হত্যা ও গাজাবাসীর ওপর অবরোধ-দুর্ভিক্ষ কঠোর করা ছাড়া কিছুই অর্জন করতে পারেনি। বরং ব্যর্থতাকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরে আরও সময় নেওয়ার কৌশল নিয়েছে।

যদিও সত্য যে, দীর্ঘ ২২ মাসের যুদ্ধে প্রতিরোধের কিছু সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু বন্দীদের উদ্ধার করা যায়নি (শুধু পূর্বনির্ধারিত চুক্তির অধীনে মুক্ত হওয়া বন্দীদের ব্যতীত)। প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো এখনও কার্যকর হামলা চালাতে সক্ষম, যদিও তাদের গতি কমেছে ও কৌশল পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে তারা স্মার্ট অ্যামবুশে মনোযোগ দিচ্ছে—যার মাধ্যমে দখলদার বাহিনীর সৈন্য ও যানবাহন থামিয়ে সর্বাধিক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো সম্ভব হচ্ছে।

যুদ্ধ কৌশল

গাজার ঘনবসতিপূর্ণ নগর ও শরণার্থী শিবিরে লড়াই হবে সহিংস ও রক্তাক্ত নগরযুদ্ধ, যেখানে দখলদার বাহিনী “পরিষ্কার করুন, ধরে রাখুন ও নির্মাণ করুন” কৌশল ব্যবহার করবে—যা আগে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান ও ইরাকে প্রয়োগ করেছিল।

“পরিষ্কার” ধাপে বাহিনী প্রতিটি এলাকায় পদ্ধতিগত অভিযান চালাবে, রাস্তাগুলো নিয়ন্ত্রণে নেবে এবং টানেল ধ্বংসের চেষ্টা করবে (যা অতীতে ব্যর্থ হয়েছিল)। সামরিক পরিভাষায় “পরিষ্কার” শব্দটি প্রায়শই বেসামরিক হত্যাকাণ্ড ও গণ উচ্ছেদের সঙ্গে জড়িত। গাজায়ও এটি বৃহৎ বিমান হামলা ও স্থল আক্রমণের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যার ফলে উত্তরাঞ্চল থেকে ১০ লাখের বেশি বেসামরিক বাস্তুচ্যুত হবে।

এরপর “ধরে রাখা” ধাপে অঞ্চলটি প্রতিরোধের পাল্টা আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখা হবে। এজন্য ফাঁড়ি নির্মাণ, টহল, পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা, ছাদ ও গলি সুরক্ষা এবং নজরদারি সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে। এই ধাপে বিশাল সামরিক ব্যয় প্রয়োজন হবে, যা দখল দীর্ঘস্থায়ী হলে আরও বাড়বে।

সবশেষে “নির্মাণ” ধাপে পুনর্গঠন, নতুন বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দখলদার কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চলবে।

এই সংঘর্ষের সময়, ইসরাইলি সেনাবাহিনী শহুরে যুদ্ধের জন্য তাদের সাঁজোয়া যান ও প্রকৌশল সরঞ্জাম ব্যবহার করবে। প্রধান যুদ্ধ ট্যাঙ্ক (মেরকাভা-৪) এবং ভারী সাঁজোয়া কর্মী বাহক (নামের) অগ্রযাত্রার নেতৃত্ব দেবে, প্রধান সড়কে টহল দেবে এবং মোবাইল পদাতিক সহায়তা দেবে। কয়েক ডজন সাঁজোয়া বুলডোজার ধ্বংসস্তূপ, বাধা এবং এমনকি সম্পূর্ণ ভবন সরিয়ে নগর যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র পাল্টে দেবে।

এদিকে ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চল ও শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঘরে ঘরে লড়াই শুরু হবে। প্রতিরোধ যোদ্ধারা রাস্তার পরিবর্তে ভবনের অভ্যন্তর দিয়ে চলাচলের জন্য দেয়াল ভেঙে পথ তৈরি করবে, যা ইসরাইলি সৈন্যদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি। কাসাম যোদ্ধারা স্নাইপার রাইফেল হাতে গোপনে অপেক্ষা করবে কিংবা রাস্তায় বিস্ফোরক পুঁতে রাখবে।

সংক্ষেপে, গাজার নগরাঞ্চলে ইসরাইল একটি ব্যাপক কৌশল নেবে, যেখানে ভারী সম্মিলিত অগ্নিশক্তি, সুড়ঙ্গ ও ভবন তল্লাশি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। দখলদার বাহিনী উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গোয়েন্দা ড্রোন (যেমন হার্মিস ৯০০) ও উপগ্রহ চিত্র ব্যবহার করে ভূখণ্ডের মানচিত্র তৈরি করবে এবং প্রতিরোধ বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবে।

প্রতিরোধ বাহিনীর প্রতিক্রিয়া

মুক্তিযুদ্ধের মতো, ভূখণ্ডই প্রতিরোধ বাহিনীর প্রধান সহায়ক। এটি আড়াল ও গোপনীয়তা দেয় এবং অ্যামবুশ, আকস্মিক আক্রমণ ও বিস্ময়কর হামলার সুযোগ তৈরি করে।

গত কয়েক মাসে প্রতিরোধ যোদ্ধারা ইসরাইলি বাহিনীর ব্যবহৃত রাস্তায় ভারী মাইন পুঁতে রেখেছে এবং ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সাঁজোয়া যান ধ্বংস করেছে। সংঘাতের এই পর্যায়েও একই ধরনের প্রতিরক্ষা কৌশল চালু থাকার সম্ভাবনা প্রবল।

কাসাম ব্রিগেডের হাতে বহু নির্দেশিত অস্ত্র রয়েছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আঘাত করলে ট্যাঙ্ক ধ্বংস করতে সক্ষম। এসব অস্ত্র ছাদ বা উঁচু তলা থেকে ইসরাইলি সাঁজোয়া যানকে লক্ষ্য করে ব্যবহার করা হয়। পদাতিক বাহিনীর অগ্রযাত্রা ধীর করার জন্য স্নাইপার দল মোতায়েন করা হবে, অগ্রসরমান বাহিনীর বিরুদ্ধে যানবাহন-বাহিত বিস্ফোরক (VBIED) ব্যবহার করা হবে এবং ইসরাইলি সেনাদের সমাবেশস্থলে মর্টার শেল ও রকেট নিক্ষেপ করা হবে।

প্রতিরোধ গোষ্ঠীর কৌশল অ্যামবুশের ওপরও নির্ভর করতে পারে—ইসরাইলি বাহিনীকে একটি এলাকায় প্রবেশ করতে দিয়ে হঠাৎ একাধিক দিক থেকে বা পিছনের সুড়ঙ্গ থেকে আক্রমণ করা। সুড়ঙ্গ অনুপ্রবেশ কৌশলে প্রতিরোধ যোদ্ধারা ইসরাইলি লাইনের পিছনে হঠাৎ উদয় হয়ে সরবরাহ কনভয় বা বিচ্ছিন্ন ইউনিটে হামলা চালাতে পারে।

প্রতিরোধ বাহিনী শহুরে যুদ্ধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্ষম, যা ইসরাইলি অভিযানকে জটিল করে তোলে এবং তাদের অগ্রযাত্রা ধীর করে দেয়। বর্তমানে তারা একধরনের “গেরিলা যুদ্ধ” পরিচালনা করছে, যেমন যুক্তরাষ্ট্র ফালুজায় কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে মুখোমুখি হয়েছিল। এখানে প্রতিটি ঘর, প্রতিটি রাস্তা ফাঁদে পরিণত হতে পারে এবং সুড়ঙ্গগুলো ইসরাইলি লাইনের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে যুদ্ধ কেবল সামনের সারিতেই নয়, বরং সৈন্য ও সরঞ্জামের পেছনের অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পূর্ববর্তী অনুরূপ যুদ্ধে দেখা গেছে, এমন পরিস্থিতির ফল হয় দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাত, যেখানে কোনও পক্ষই নির্ণায়ক বিজয় পায় না। প্রতিরোধ বাহিনী কোনও কেন্দ্রিক কাঠামো নয় যে নেতৃত্ব বা কয়েকটি ইউনিট ধ্বংস করে দুর্বল করা সম্ভব; বরং এটি একটি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা, যা চাপের মুখে ছোট, বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীতে রূপ নিয়ে বিকেন্দ্রীভূত অভিযান চালাতে সক্ষম—যেমন হিট-এন্ড-রান আক্রমণ, জটিল বহু-লক্ষ্য অ্যামবুশ ও স্থানীয়ভাবে তৈরি ইম্প্রোভাইজড বিস্ফোরক ব্যবহার।

প্রতিরোধ যোদ্ধারা ভূখণ্ড ও আশপাশ সম্পর্কে সুপরিচিত, এবং তাদের মূল লক্ষ্য ইসরাইলের মতো নির্ণায়ক বিজয় নয়, বরং আক্রমণকে ব্যয়বহুল, বেদনাদায়ক ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলা, যাতে শতাধিক দখলদার সেনার প্রাণহানি ঘটে—যেমনটি ইসরাইলি বিশ্লেষকরাও অনুমান করেছেন।

কেন এটি বিপজ্জনক অভিযান?

সম্প্রতি এনবিসি উপকূলীয় স্ট্রিপের প্রান্তে ইসরাইলি সামরিক যানবাহনের উপগ্রহচিত্র প্রকাশ করেছে, যা মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে আসন্ন নতুন স্থল আক্রমণের ইঙ্গিত।

একই সময়ে, ইসরাইলের এই রক্তক্ষয়ী পরিকল্পনা থেকে সরে আসার জন্য আন্তর্জাতিক আহ্বান উঠেছে—অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেনের মতো মিত্ররাও এর নিন্দা করেছে। জার্মানি ঘোষণা করেছে যে তারা গাজায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি বন্ধ করবে।

ইসরাইলের অভ্যন্তরেও বিরোধিতা তীব্র। প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিরোধী রাজনীতিকরা সামরিক অচলাবস্থার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ায়ার ল্যাপিড সরকারের এই পদক্ষেপকে “বিপর্যয়” আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এটি জিম্মিদের হত্যার ঝুঁকি বাড়াবে এবং ব্যয় হবে কয়েক বিলিয়ন ডলার।

বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বিরোধিতার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। নতুন অভিযানটি কেবল আগের ব্যর্থ পরিকল্পনার সম্প্রসারণ, যার মধ্যে যুদ্ধের শুরুতে চালানো স্থল আক্রমণও অন্তর্ভুক্ত।

গাজা একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, সুড়ঙ্গ ও অবকাঠামোয় ভরপুর। এটিকে “পরিষ্কার” ও “পুনর্গঠন” করার লক্ষ্য নিয়ে সেনা পাঠানো যেকোনো বাহিনীর জন্য অত্যন্ত জটিল। ইতিহাসে এই ধরনের অভিযান কখনও চূড়ান্ত সাফল্য আনতে পারেনি।

বেসামরিকদের ক্ষেত্রে, সবাই পালাতে পারবে না—বিশেষ করে অসুস্থ, বয়স্ক ও নারী। এমন অঞ্চলে, যা প্রায় দুই বছর ধরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত এবং প্রতিদিন বোমাবর্ষণের শিকার, আক্রমণ অনিবার্যভাবে গণহত্যায় পরিণত হবে।

রাজনৈতিক দিক থেকেও দখলদার সরকারের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর কোনও স্পষ্ট রূপরেখা নেই। হামাসের হাতে বন্দীদের মুক্ত করার লক্ষ্য থাকলেও, পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াবে—যেমন অতীতে ঘটেছে। অর্থাৎ সামরিক পদক্ষেপ রাজনৈতিক লক্ষ্যকেও ব্যর্থ করতে পারে।

সংক্ষেপে, ইসরাইলের এই পরিকল্পনা নির্ণায়ক বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও, সেই বিজয়ের কোনও স্পষ্ট সংজ্ঞা বা তা অর্জনের বাস্তব পথ নেই। বরং এটি অনাহার, হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞ বাড়ানোর রেসিপি। দখলদার সেনার জন্যও এটি এক অন্তহীন, লক্ষ্যহীন যুদ্ধ, যা তাদের শক্তি ক্ষয় করবে এবং ডজন ডজন—সম্ভবত শতাধিক—সৈন্যের লাশ ফেরত আনবে।

সূত্র : আল জাজিরা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top