ক্রিকেট

পেশাদারি ক্রিকেট ও শরয়ী দৃষ্টিকোণ

ইসলাম সকল প্রকার খেলাধুলা ও বিনোদনকে এককভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি। বরং যেসব খেলাধুলা শরীর ও মনের উপকারে আসে এবং শক্তি বৃদ্ধি করে—ইসলাম সেগুলোর প্রতি উৎসাহ জাগিয়েছে। এমনকি কিছু খেলাধুলার প্রতি সরাসরি অনুমতিও দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ ﷺ।
সুনানে আবু দাউদে উক্ববাহ ইবনু ‘আমির রাযি. থেকে বর্ণিত—
“একটি তীরের কারণে আল্লাহ তাআলা তিন ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন: ১️. তীর প্রস্তুতকারীকে—যদি সে জিহাদের নিয়তে তা প্রস্তুত করে, ২️. তীর নিক্ষেপকারীকে, ৩. এবং যে ব্যক্তি তীর নিক্ষেপকারীর জন্য তা প্রস্তুত করে সরবরাহ করে। তাই তোমরা তীরন্দাজী ও অশ্বারোহণ শিখো। তীরন্দাজী আমার নিকট অশ্বারোহণের চেয়েও প্রিয়।”
এরপর নবী ﷺ বলেন—“তিন প্রকার খেলা অনুমোদিত: ১️. নিজের ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া,
২️. বৈধভাবে স্ত্রীর সাথে খেলা-স্ফূর্তি করা (পরিবারের সাথে মানসম্পন্ন সময় কাটানো), ৩️. তীর-ধনুকের অনুশীলন করা। আর যে ব্যক্তি তীরন্দাজী শিখে পরে অনাগ্রহবশত তা ছেড়ে দেয়, সে আল্লাহর এক নেয়ামতের অবমূল্যায়ন করল।” (সূত্র: সুনান আত-তিরমিযী ২৭৭/১৭০৩, সুনান ইবনু মাজাহ ৬১৮/২৮১১, সুনান আবু দাউদ ২৫১৩)
উক্ত হাদীসে এই তিন প্রকার খেলাধুলাকে ‘লাহ্‌ও’ (অর্থাৎ অর্থহীন বা অনর্থক বিনোদন) থেকে পৃথক করা হয়েছে। ইসলামী দৃষ্টিতে “লাহ্‌ও” হলো এমন কিছু, যার মধ্যে কোনো ধর্মীয় বা পার্থিব উপকারিতা নেই। অথচ এই তিন প্রকার খেলাধুলার প্রত্যেকটিই বিভিন্ন দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী।
খেলাধুলা সম্পর্কে ইসলামী আইনবিদদের নির্ধারিত মূলনীতি
ইসলামী ফিকহবিদগণ কুরআন-হাদীসের দলিলের আলোকে খেলাধুলার বিষয়ে কিছু সাধারণ নীতি নির্ধারণ করেছেন, যা আধুনিক যুগের খেলাধুলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
১️. খেলাটি মূলগতভাবে বৈধ হতে হবে। এর মধ্যে কোনো হারাম বা শরীয়তবিরোধী বিষয় থাকা চলবে না।
২️. খেলাধুলার মধ্যে ধর্মীয় বা পার্থিব কোনো বাস্তব উপকারিতা থাকতে হবে। নিছক সময় কাটানো বা বিনোদনের উদ্দেশ্যে খেলা জায়েয নয়।
৩️. খেলাধুলার সাথে কোনো হারাম বিষয় সংযুক্ত থাকা চলবে না। যেমন—গান-বাজনা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, জুয়া, অশ্লীলতা ইত্যাদি।
৪️. খেলাধুলার প্রতি আসক্তি এমন পর্যায়ে যাবে না, যাতে ধর্মীয় কর্তব্য (নামায, মসজিদে গমন, ইবাদত ইত্যাদি) অবহেলিত হয়ে পড়ে।
সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যা ‘তাকমিলায়ে ফতহুল মুলহিম’ এ বলা হয়েছে—“যে খেলাধুলার মধ্যে কোনো ধর্মীয় বা পার্থিব কল্যাণ নেই এবং নিছক বিনোদন উদ্দেশ্য—তা হারাম। আর যেসব খেলাধুলার মধ্যে বাস্তব কল্যাণ নিহিত আছে, কিন্তু কুরআন-হাদীসে তার নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায়, সেগুলোও হারাম। আর যেগুলোর মধ্যে নিষেধ নেই এবং উপকারিতা আছে, সেগুলো বৈধ। তবে যদি তাতে মানুষ ইবাদত ও দায়িত্ব থেকে গাফেল হয়ে পড়ে, তাহলে সেটিও হারামের আওতায় আসবে। আর যদি কল্যাণ ও প্রয়োজনের উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তা বৈধ; কখনো মুস্তাহাবও হতে পারে।” (তাকমিলায়ে ফতহুল মুলহিম ৪/৪৩৫)
পেশাদারি ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য দিকগুলো
উপরোক্ত নীতির আলোকে দেখা যায়—আধুনিক যুগের অধিকাংশ খেলাধুলাই ইসলামী দৃষ্টিতে সমস্যাযুক্ত, যেমনঃ
খেলোয়াড়দের পোশাকে সতর প্রকাশ পায় বা দেহের গঠন স্পষ্ট ফুটে ওঠে, জুয়া, বাজি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত থাকে, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হয়,
খেলাধুলার মৌসুমে মানুষ নামায-ইবাদত ও দায়িত্ব থেকে গাফেল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে আজকাল সমাজে এক ধরণের বিনোদনমুখী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে যুব সমাজের সময় ও মনোযোগের প্রধান অংশ ব্যয় হচ্ছে খেলার পেছনে। অনেকেই ফরজ ইবাদত উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলায় বা টিভির পর্দায় ডুবে থাকে।
নারীদেরও এখন এ বিনোদন সংস্কৃতিতে পুরুষদের সমান্তরালে যুক্ত করা হচ্ছে, মিডিয়া ও পুঁজিবাদী শক্তি তাদের নারীত্বকে বাজারজাত করছে। মনে হয় যেন মানবজাতির সৃষ্টি ও উদ্দেশ্যই শুধুমাত্র বিনোদন!
আল্লাহ তাআলা বলেন—“একদল মানুষ আছে যারা না বুঝেই আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য অর্থহীন কথাবার্তায় লিপ্ত হয় এবং এগুলোকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বিষয় বানায়। তাদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।” (সূরা লুকমান, আয়াত ৬)
ইমাম হাসান আল-বাসরী রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন—“রাতের আড্ডা, গল্পগুজব, গান-বাজনা ও যে কোনো কিছু যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত থেকে উদাসীন করে—সবই ‘লাহ্‌ও আল-হাদীস’-এর অন্তর্ভুক্ত।” (রুহুল মাআনী ১১/৬৬)
খেলাধুলাকে পেশা বানানোর বিধান
কেউ যদি খেলাধুলাকে উপার্জনের মাধ্যম বানায় এবং নিছক বিনোদনের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করে, তাহলে তা বৈধ নয়।
মাজমাউল আনহুর-এ বলা হয়েছে—“অবৈধ কাজের পারিশ্রমিক বৈধ নয়। যেমন—গান-বাজনা, পেশাদারি কান্নাকাটি বা নিছক বিনোদনমূলক খেলাধুলা। যদি বিনোদনের জন্য পারিশ্রমিক দেওয়া হয়, তা ফেরত দিতে হবে। তবে যুদ্ধ, কাফেলার সংকেত বা বিবাহের ঘোষণার মতো বৈধ কাজে যদি ঢাক বাজানো হয়, তার পারিশ্রমিক বৈধ।” (মাজমাউল আনহুর ২/৩৮৪)
সারকথা, ক্রিকেট বা অন্যান্য খেলাধুলায় যদি শরীয়তবিরোধী কোনো বিষয় না থাকে এবং খেলার উদ্দেশ্য হয় শরীরকে সুস্থ রাখা, ক্লান্তি দূর করা, দায়িত্ব পালনের ব্যাঘাত না ঘটানো—তাহলে সীমিত পর্যায়ে তা জায়েয।
কিন্তু পেশাদারি ক্রিকেট আজ নিছক শরীরচর্চা নয়—এটি জুয়া, বাণিজ্য, অপচয়, নারী-পুরুষের মেলামেশা ও ধর্মীয় উদাসীনতার মিশ্র এক বিনোদনশিল্পে পরিণত হয়েছে। তাই ইসলামী দৃষ্টিতে এর অনুমোদন নেই।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
لست من دد ولا الدد مني
“আমি খেলাধুলার লোক নই, খেলাধুলা আমার আদর্শ নয়।”
এ বক্তব্য ব্যক্তিগত পর্যায়ের উপকারী খেলাধুলার বিপরীত নয়; বরং অর্থহীন, দায়িত্বহীন ভোগবাদী খেলাধুলার নিন্দা।
মূল: জামিয়া ইসলামিয়া বিন্নুরী টাউন, করাচি
অনুবাদ ও সম্পাদনা: আফফান বিন শরফুদ্দিন
সংযোজন: মুফতী সাইফুদ্দিন গাজী হাফিযাহুল্লাহ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top