মুফতি মুহাম্মদ আমিন পালনপুরি হাফি.
বর্তমান যুগে “মিলাদ মাহফিল” নামে যে বিশেষ আয়োজন দেখা যায়—সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন কিংবা সালাফে সালেহীনের যুগে এর কোনো অস্তিত্বও ছিল না। ইতিহাসে প্রথমবার এ ধরনের মাহফিলের প্রচলন ঘটে ৬০৪ হিজরিতে। সুলতান আবু সাঈদ মুজাফফর উদ্দিন আরবাল সর্বপ্রথম প্রচলিত মিলাদ মাহফিলের সূচনা করেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলভি আবুল খাত্তাব উমর ইবনে দিহইয়া এ বিষয়ে প্রমাণাদি একত্রিত করেন এবং এ সমাবেশকে সমর্থন জানান। বিনিময়ে সুলতান তাঁকে বিপুল অর্থ প্রদান করেছিলেন।
সেই বাদশাহর ব্যাপারে আল্লামা যাহাবি রহ. বলেন—
كَانَ يُنفِقُ كُلّ سَنةٍ عَلَى مَوْلِدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَحْوَ ثَلَاثِ مأة الف،
‘সে প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মিলাদ (জন্মোৎসব) উপলক্ষে আনুমানিক তিন লাখ টাকা খরচ করত”। দুওয়ালুল ইসলাম ২/১০৩
আর আবুল খাত্তাব উমর ইবনে দিহইয়ার ব্যাপারে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন—
وَكَانَ ظَاهِرَى الْمَذْهَبِ كَثِيرَ الْوَقِيعَةِ فِي الْآئِمَةِ وَ فِي السَّلَفِ مِنَ الْعُلَمَاءِ خَبِيثَ اللَّسَانِ أَحْمَقَ شَدِيدَ الكبْرِ قَلِيْلَ النَّظْرِ فِي أَمُورِ الدِّينِ مُتَهَاوِنًا.
“সে যাহিরি (গাইরে মুকাল্লিদ) মতাবলম্বী ছিল, ইমামগণ ও সালাফে সালেহীনের মর্যাদার ব্যাপারে বেয়াদবি করত, অশ্লীল ভাষার ব্যবহারকারী, নির্বোধ ও অহংকারী স্বভাবের লোক ছিল। দ্বীনের ব্যাপারে ছিল উদাসীন ও বেপরোয়া।” লিসানুল মিযান ৪/২৯৬
মূলত এই দুই ব্যক্তির মাধ্যমেই প্রচলিত মিলাদ মাহফিল চালু হয়। এতে তিনটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল—
১. রবিউল আউয়াল মাসের নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা।
২. আলিম ও নেককারগণকে একত্রিত করা।
৩. মাহফিল শেষে খাবারের আয়োজন করে তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রূহের সওয়াবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা।
এসব ভিত্তিহীন শর্তাবলির কারণে অনেক খ্যাতিমান আলেমগণ—যেমন আল্লামা ফাকিহানি ও তাঁর সমসাময়িক উলামা—এতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন এবং একে স্পষ্টভাবে বিদআতে দ্বালালাহ (ভ্রষ্ট বিদআত) আখ্যা দেন। তবে কিছু স্বার্থবাদী আলেম বাদশাহর মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে এ কাজকে সমর্থন করেন এবং এর বৈধতা-সংক্রান্ত ফতোয়াও প্রদান করেন।
শুরুতে এ মাহফিল শুধু আলেম ও নেককারদের ইজতিমা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ জনগণও এতে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ শুরু করে এবং ধীরে ধীরে এতে নতুন নতুন সংযোজন ঘটতে থাকে। এর ফলে বিদআতের স্রোত বয়ে যায় সর্বত্র। সুতরাং বর্তমান যুগে “ঈদে মীলাদুন্নবী” নামে যে আচার-পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, সেটিই ইতিহাসে “প্রচলিত মিলাদ” নামে পরিচিত।
প্রচলিত মিলাদের মূল উদ্দেশ্য হলো—হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাজির-নাজির মনে করে তাঁর জন্ম সম্পর্কে বানোয়াট গল্প ও মনগড়া কাহিনী বর্ণনা করা। এ মাহফিলে যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জন্মের আলোচনা আসে, তখন উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে যায়, গাওয়া হয় জন্মোৎসবের বিশেষ গান, আর দাড়িহীন কিশোরদের মধুর কণ্ঠে গজল পরিবেশন করা হয়। এ ধরনের সমাবেশে মহিলারাও সাজসজ্জাসহ অংশগ্রহণ করে; অনুষ্ঠান হয় জাঁকজমকপূর্ণ; শেষে শিন্নি ও খাবার বিতরণ করা হয়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা ও প্রশংসায় অতিরঞ্জিত উক্তি করা হয়। এমনকি অনেকে মনে করে—মিলাদ মাহফিলে অংশগ্রহণ করা ফরজ বা ওয়াজিব থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতের কারণ, আর যারা অংশগ্রহণ করে না তারা নাকি অভাগা। এর ফলে নামাযের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত অবহেলিত হয়, গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা করা হয় না, তবু বিশ্বাস করা হয় যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বশরীরে মাহফিলে আগমন করেন।
কিছু স্থানে তো আরও ভয়াবহ বিদআত দেখা যায়। ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে রওযায়ে আতহার বা বায়তুল্লাহ শরীফের অনুরূপ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। কোথাও বিশাল চতুর্ভুজাকার মঞ্চ বানানো হয়, যেটিকে বাইতুল্লাহর প্রতিরূপ মনে করে মানুষ তার চারপাশে তাওয়াফ করতে থাকে এবং সেখান থেকে বরকত হাসিলের আশায় ঝুঁকে পড়ে।
প্রচলিত মিলাদের বিধান
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সর্বসম্মত অভিমত হলো—প্রচলিত মিলাদ পালন করা হারাম ও বিদআত। আল্লামা ইবনুল হাজ্জ মালিকী রহ. তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আল-মাদখাল-এ লিখেছেন—
وَ مِنْ جُمْلَةِ مَا أَحْدَثُوهُ مِنَ الْبَدَعِ —مَعَ اعْتِقَادِهِمْ أَنْ ذلِكَ مِنْ أَكْبَرِ الْعِبَادَاتِ وَإِظْهَارِ الشَّعَائِرِ مَا يَفْعَلُونَهُ فِي شَهْرِ رَبِيعِ الْأَوَّلِ مِنَ الْمَوْلِدِ وَقَدِ احْتَوى عَلى بِدَع وَمُحَرَّمَاتٍ جَمةٍ .
‘তাদের সৃষ্টি করা বিদআতের মধ্যে একটি হলো—রবিউল আওয়াল মাসে মিলাদ উদযাপন, যাকে তারা সবচেয়ে বড় ইবাদত ও দ্বীনের শিআর (প্রতীক) হিসেবে গণ্য করে। অথচ এই ‘মাওলিদ’ অনুষ্ঠান অনেক বিদআত ও হারাম বিষয়ের সমষ্টি।’ আল-মাদখাল, ২/৩
তেমনি, কাজি শিহাবুদ্দীন দাওলাত আবাদী রহ. তাঁর ফতোয়া গ্রন্থ তুহফাতুল কুযাত-এ বলেন—
سُئِلَ الْقَاضِي عَنْ مَجْلِسِ الْمَوْلِدِ الشَّرِيفِ، قَالَ : لَا يَنْعَقِدُ ، لأنه مُحْدَث وَكُلُّ مُحْدَثٍ ضَلَالَةٌ وَكُلُّ ضَلَالَةٍ فِي النَّارِ، وَ مَا يَفْعَلُونَ مِنَ الْجُهَّالِ عَلَى رَأْسِ كُلِّ حَوْلٍ فِي شَهْر رَبِيعِ الْأَوَّلِ لَيْسَ بِشَيْءٍ ، وَ يَقُومُونَ عِندَ ذِكْرٍ مَوْلِدِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَيَزْعُمُونَ أَنَّ رُوحَهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَجِيءُ وَحَاضِرٌ فَزَعْمُهُمْ بَاطِلٌ، بَلْ هَذَا الْاعْتِقَادُ شرك وَ قَدْ مَنَعَ الأَئِمَّةُ الأَرْبَعَةُ عَنْ مِثْلِ هَذَا
কাজি সাহেবকে যখন মিলাদ মাহফিল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি বললেন: মিলাদ মাহফিল শরীয়তসম্মত কোনো আমল নয়; কারণ এটি বিদআত। আর প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহী এবং প্রত্যেক গোমরাহী জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। মুসলমানরা যে প্রতি বছর রবিউল আউয়ালে এ অনুষ্ঠান করে, এর কোনো শরয়ী ভিত্তি নেই। তদুপরি, তাঁরা যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের কথা উল্লেখ করে দাঁড়িয়ে যায় এবং মনে করে যে নবীজির রূহ মাহফিলে উপস্থিত হন—এ বিশ্বাস সম্পূর্ণ বাতিল, বরং সরাসরি শিরক। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের চার ইমামই এ ধরনের বিশ্বাস রাখা নিষিদ্ধ করেছেন।” আল জুন্নাহ লিআহলিস সুন্নাহ ২০২ পৃ.




