এসএম নাহিদ হাসান
হঠাৎ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে আমার চিন্তার কিছু ব্যক্তিগত কারণ আছে। প্রথমত জামাত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামিক রাজনৈতিক মুভমেন্ট। দাওয়াতি প্লাটফর্ম হিসেবেও বড় কি না বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বিচারে এটাই সর্ববৃহৎ। একজন দায়ী হিসেবে বা ন্যুনতম সাধারণ মুসলিম হিসেবে সবাই এই দল নিয়ে চিন্তিত থাকবে।
কিন্তু আশ্চর্যজনক হলো সর্ববৃহৎ এই মুভমেন্টটি সেকুলারদের কাছে যতটা না সমালোচিত তার চেয়ে বেশি সমালোচিত ইসলামিস্টদের কাছে। আর সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দলটি যদি খোদ ইসলামিস্টদের কাছেই অগ্রহণযোগ্য হয় তাহলে তো বিপদ। সেকুলারদের কাছে আরও দুর্বল হয়ে যাবে। যেটা আমরা বছরের পর বছর দেখে আসছি।
আমি আমার ব্যক্তিগত অবজারভেশনে আজ জামায়াতের সম্ভাবনা ও সমালোচনার কিছু বিষয় তুলে ধরবো। যথাসম্ভব নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করবো যেহেতু আমি শত্রু নই আবার দলেরও কেউ না।
প্রথমে দেখি কারা জামায়াতের সাথে দ্বিমত করে বা একে ভিলিফাই করে।
এক. সেক্যুলাররা: বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাদের ভূমিকার কারণে। এ নিয়ে নিরপেক্ষ বিচার করা কঠিন। কিন্তু মোটা দাগে কারো যুলুমের পক্ষে দাঁড়ানো নিসন্দেহে খারাপ কাজ। বাকি আঞ্চলিক ভু-রাজনৈতিক কারণে তাদের অন্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে। সে যে ব্যাখ্যাই থাকুক সরাসরি যুলুমের পক্ষে দাঁড়ানো নিসন্দেহে সমালোচনার কাজ। তবে এটাওতো অতীত। বর্তমান কালের কর্মী সমর্থকেরা তো আর সেই দায় নিবে না।
দুই. কওমি অংগন: এদের সমালোচনা আকিদাগত কারণে। মূল বিষয় হলো মৌদুদিবাদ। এটা কি আমার ধারণা পরিস্কার না। যত অভিযোগ দেখি সব তাত্ত্বিক। যেমন অভিযোগ করা হয় তারা নবীদের মাসুম বা নিস্পাপ মনে করেন না। সাহাবিদের মিয়ারে হক বা সত্যের মানদণ্ড মনে করেন না। কিন্তু বাস্তবে আমি এমন কোন বিশ্বাস তাদের মধ্যে দেখিনি। আদম আ ফল খেয়ে ভুল করেছেন বা ইউনুস আ আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া তার জনপদ ত্যাগ করেছেন বললে কেন খারাপ আকিদা হবে। এটাতো কুরানেই আছে। আর এর সাথে নিষ্পাপ না হওয়ার কি সম্পর্ক। দ্বিতীয়ত যেকোন একক সাহাবা হকের দলিল না বরং সাহাবাদের ইজমা হলো হকের দলিল। এটাই তারা বলে আর এটাই আরব আলিমদের আকিদা যা আমি দেখেছি। তাহলে কি তারাও মৌদুদিবাদে আক্রান্ত!
তিন: শরীয়াপন্থী ও অগণতান্ত্রিক ফান্ডামেন্টালিস্টদের কাছে তারা বেশ সমালোচিত। মূল কারণ কিভাবে ইসলাম রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে তার ব্যাখ্যা নিয়ে দন্দ্ব। কেউ কেউ মনে করেন যেহেতু জামাত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশ নিয়েছে তাই তার আকিদাতেই ত্রুটি আছে। কিন্তু এখানে তারা একই কারণে আবার খেলাফাত মজলিস বা ইসলামি আন্দোলনকে অতো সমালোচনা করেন না। এর কারন হলো তাদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠা পেতে তারা পশ্চিমাদের সাহায্য প্রার্থনা করে এবং তাদের খুশি করতে গিয়ে শরিয়াপন্থী মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করে যা অন্যান্যরা করে না।
এই পয়েন্টে আমার অবজারভেশন হলো গনতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ কিন্তু যদি না মানুষের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় বিশ্বাস করা হয় এবং কৌশল হিসেবে এটা অবলম্বন করা হয় তাহলে এটা আকিদাগত ভুল না। কৌশলগত ত্রুটি বললেও সেটা কোন এবসুলিউট বিষয় নয়। একেক পক্ষ একেকভাবে চিন্তা করতে পারে। মূল সমস্যা হলো এটা নবীদের পথ নয় যেভাবেই হোক ক্ষমতায় যেতে হবে। আর রাজনৈতিক বিজয়কেই মেহনতের মূল বিষয় করা।
আর পশ্চিমাদের খুশি করা বা তাদের কাছে গুড বয় হয়ে শরীয়াপন্থীদের বিরুদ্ধে যাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এটাতো মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফিরকে সহযোগিতার অভিযোগ। অত্যন্ত ভয়াবহ। কিন্তু এর বাস্তবতা আমার কাছে প্রমাণিত নয়। আমি যত এদের সাথে মিশেছি এখন পর্যন্ত এমন কোন ভালো পর্যায়ের কর্মী বা নেতাকে দেখিনি তারা পশ্চিমাদের তোয়াজ করে। উচ্চ পর্যায়ে কি হয় আমার জানা নাই।
দ্বিতীয় অভিযোগ তারা ইসলামি শরীয়াত চায় না। আমি এদের অনেক স্কলারদের সাথে মিশেছি। আসলে ইসলামি শরিয়াত না চাইলে ইসলামি দলতো দূরের কথা মুসলিম কি থাকা যায়? সুতরাং তারা ইসলামি শরীয়াত চায় না এই অভিযোগ সঠিক নয়। অনলাইনে বিক্ষিপ্ত কিছু পোস্ট বা বিক্ষিপ্ত কিছু নেতার কিছু বক্তব্য সবার উপরে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।
এবার আসি তাদের সম্ভাবনা ও ভালো দিকের আলোচনায়। জামাত নিসন্দেহে একটা ত্যাগি ইসলামি দল। তাদের কর্মীরা সুসংগঠিত। নিয়মতান্ত্রিক। কুরবানী করতে সদা প্রস্তুত। তারা তাদের মিশনে অটল। আর একটা বিষয় হলো এদের সবর অনেক। বিক্ষিপ্ত কিছু বিষয় ছাড়া যে যাই বলুক তাদের সাথে তেমন শত্রুতা করে না। তাদের কর্মিদের মধ্যে ইসলাম নিয়ে পড়াশোনার তাকিদ আছে। এগুলো নিসন্দেহে ভালো দিক।
সবশেষে আমার কিছু পরামর্শ:
১) গুরতর অভিযোগগুলো আমলে নেওয়া বিশেষ করে পশ্চিমাদের খুশি করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরত্বের সাথে বিবেচনা করা। এটা সত্য হলে ধ্বংস অনিবার্য।
২) ইসলামের সঠিক ও গভীর জ্ঞান অর্জন করা উচিৎ। এরা অধিকাংশই পড়ে কিন্তু খুবই স্পেসিফিক ও দলীয় বইপত্র। এর বাইরেও অনেক কিছু জানা বোঝার আছে।
৩) গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কোনভাবেই নবীদের পথ ও পদ্ধতি নয়। সুতরাং এটাকে মাকসাদ না করে কৌশল হিসেবে বিশ্বাস করা। এটার চেয়ে দাওয়াতি কাজ করে গণমানুষকে দ্বীন শিখিয়ে গণবিপ্লব করার প্লান করা। যদিও বা এই জনপদে এটা অত্যন্ত সবর ও পরিশ্রমের কাজ। কিন্তু এটাই এখানকার জন্য ভালো রাস্তা। আর সঠিক রাস্তায় থাকা জরুরি যদিওবা সহসা গন্তব্যে না পৌছানো যায়। ভুল রাস্তার গন্তব্য কখনো সঠিক হয় না। অধিকাংশ নবিই তার এলাকায় তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। তাই বলে তারা ব্যর্থ ছিলেন না।
৪) বাহ্যিক ও ভিতরকার আমলে উদাহরণ তৈরি করা। স্রেফ ফরজ আমলেই (যেমন পর্দা) যদি নেতা কর্মীদের গাফেল দেখা যায় তাহলে মানুষ তাদের ইসলামের জন্য কেন সমর্থন দেবে! পারস্পরিক লেনদেনে তাদের ব্যাপার বিস্তর অভিযোগ। এখানে খারাপ উদাহরণ না হয়ে ভালো উদাহরণ হতে হবে।
৫) দ্বীন দুনিয়া ৫০-৫০ এই মুডে না চলা। দ্বীনই সব। দুনিয়া জরুরত কেবল।
৬) স্থান কাল অনুযায়ী মানুষের ভিন্ন ভিন্ন কৌশল থাকে। হুদুদ ছাড়া ইসলামের বিচার ব্যবস্থাও স্থান কাল অনুযায়ী অনেক পরিবর্তন হয়। কিন্তু এর মানে চিন্তায় মর্ডানিস্ট না হওয়া। দ্বীনের মৌলিকত্বই আসল। এটা না থাকলে দ্বীনই থাকবে না। সুতরাং যুগের সাথে সাথে যেন মৌলিক চিন্তা চেতনা হারিয়ে না যায়।
সবশেষে যা কিছু আমি বলেছি তা আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ মাত্র। কাউকে খুশি করতে বা শত্রুতা করতে লিখিনি। বিশাল এই জামায়াতের থেকে ইসলামের সর্বোচ্চ সেবা আশা করি। এটা আমাদের সম্ভাবনা যেন হয়। এটা আমাদের জন্য ধ্বংসাত্মক না হয়। মহান আল্লাহ সহজ করেন।।




