মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক হুমকির প্রেক্ষিতে গাজার ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলি তাদের প্রস্তুতি এবং সতর্কতা উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করেছে। নেতানিয়াহু যিনি বর্তমানে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নজরদারিতে আছেন, তিনি হামাসকে উৎখাত এবং গাজায় বন্দী “জিম্মিদের” মুক্ত করার জন্য বিকল্প সামরিক পন্থা গ্রহণের হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্পও মন্তব্য করেছেন যে, “হামাস কোনও চুক্তি চায় না এবং তাদের পতন ঘটবে।”
এই হুমকিগুলির প্রতিক্রিয়ায়, গাজার প্রতিরোধ গোষ্ঠী—বিশেষত ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস—সংঘর্ষের সম্ভাব্যতা বিবেচনায় নিয়ে মাঠ পর্যায়ে সতর্কতার মাত্রা বাড়িয়েছে। এক ফিল্ড কমান্ডার আল-জাজিরা নেটকে জানিয়েছেন, তাদের যোদ্ধারা যেকোনো ইসরাইলি অপারেশন, বিশেষ করে বন্দী উদ্ধারের চেষ্টাকে প্রতিহত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ইসরাইল যদি কোনো স্থল অভিযান পরিচালনা করে তবে তারা সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
নিরাপত্তা ও সামরিক বিশ্লেষক রামি আবু জুবাইদাহ মনে করেন, গাজায় ইসরাইলি বন্দীদের ইস্যু একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং এখন এটি একটি সামরিক সমাধানের দিকে ধাবিত হতে পারে। তিনি বলেন, মার্কিন অবস্থানে পরিবর্তনের কারণে, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ এখন “তাৎক্ষণিক মুক্তি” প্রোটোকল সক্রিয় করেছে, যা যেকোনো আকস্মিক হামলার ক্ষেত্রে বন্দীদের মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আবু জুবাইদাহ আরও জানান, গোপন অভিযানের জন্য ইসরাইলি প্রস্তুতি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা কেবল গাজার ভেতরেই নয়, বিদেশে অবস্থানরত প্রতিরোধ নেতাদের দিকেও লক্ষ্য করছে। এর ফলে প্রতিরোধ নেতারা তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে বাধ্য হয়েছে।
এদিকে গাজার এক প্রতিরোধ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলি ইসরাইলি বন্দীদের নিরাপত্তা ইউনিটগুলোর প্রস্তুতি বাড়িয়েছে এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি বা যানবাহনের ওপর নাগরিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, ইসরাইল তাদের অভিযানের সম্ভাব্য সময় হিসেবে এই সংকটপূর্ণ মুহূর্তটিকেই বেছে নিতে পারে, যখন গাজার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। তবে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলি গোপন টানেল, অ্যামবুশ এবং বিকেন্দ্রীভূত আক্রমণ কৌশলের মাধ্যমে যেকোনো ইসরাইলি আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক উইসাম আফিফা বলেন, এই উত্তেজনা কেবল আমেরিকান অবস্থান থেকে পশ্চাদপসরণ নয়, বরং মধ্যস্থতার আড়ালে থাকা রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলোর উন্মোচনও। তিনি ব্যাখ্যা করেন, হামাসের হাতে বর্তমানে চারটি কৌশলগত কার্ড রয়েছে:
১. বন্দী ইস্যু: যা দখলদার ইসরাইলকে ক্লান্ত করে রাখছে এবং হামাসকে আলোচনায় প্রধান ভূমিকা দিচ্ছে।
২. ইসরাইলি হোম ফ্রন্ট: যা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও মানসিক সংকটে ভুগছে।
৩. গাজা ফ্রন্ট: যেখান থেকে নিয়মিতভাবে টানেল হামলা ও সংঘর্ষ চালিয়ে দখলদার বাহিনীকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
৪. আঞ্চলিক জনমত: যা দখলদার ইসরাইলকে সমর্থনকারী সরকারগুলোকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলছে।
আফিফা মনে করেন, ট্রাম্পের বক্তব্য কোনো “জিহ্বার স্খলন” নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের অধিকার অস্বীকার করে কেবল ইসরাইলের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া মার্কিন নীতির প্রকাশ।
উল্লেখ্য, ২০ দিন আগে হামাস এবং ইসরাইলের মধ্যে কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছিল। তখন মার্কিন প্রশাসন আশা করেছিল ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি হতে পারে। কিন্তু সর্বশেষ প্রস্তাবে হামাসের প্রতিক্রিয়া দেখে মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফ দোহা থেকে আলোচক দল প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর প্রস্তুতি ইঙ্গিত দেয় যে, তারা কেবল একটি আসন্ন অভিযান ঠেকাতে নয়, বরং গাজার ভবিষ্যতের রাজনীতিতে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করতে চাচ্ছে—যেখানে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার স্বীকৃতি না পেলে কোনো নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
সূত্র : আল জাজিরা




