ইসরাইলি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির গ্যানোট কারাগারে হামলা চালিয়ে কারাবন্দী ফিলিস্তিনি নেতা মারওয়ান বারঘৌতিকে সরাসরি হুমকি দেওয়ার একটি ভিডিও ক্লিপ ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ফিলিস্তিনি জাতীয় মুক্তি আন্দোলন (ফাতাহ) এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বারঘৌতিকে উদ্দেশ্য করে বেন গভির কারাগারে বলেন, ‘আপনি জিততে পারবেন না। যে কেউ ইসরাইলের জনগণকে লক্ষ্য করে আমাদের ছেলে-মেয়েদের হত্যা করবে, আমরা তাদের নির্মূল করব।’
ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স ক্লাবের প্রধান আবদুল্লাহ আল-জাগারি এক বিবৃতিতে বলেন, জাতীয় নেতার প্রতি ফ্যাসিস্ট মন্ত্রীর এই হুমকি দখলদারদের তাকে নির্মূল করার এবং কারাগারে আটক নেতাদের হত্যা করার ইচ্ছার স্পষ্ট ঘোষণা, বিশেষ করে গাজায় নির্মূল যুদ্ধের শুরু থেকে বন্দীদের উপর অভূতপূর্ব অপরাধের প্রেক্ষাপটে।
সংগ্রামের যাত্রা
মারওয়ান বারঘৌতি ১৯৫৯ সালে রামাল্লাহ এবং আল-বিরহের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত কোবার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ইসরাইল যখন পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেম দখল করে তখন তার বয়স ছিল নয় বছর। তিনি ১৫ বছর বয়সে ফাতাহ আন্দোলনে যোগ দেন।
১৯৭৬ সালে প্রথমবার গ্রেপ্তার হন, পরে ১৯৭৮ এবং ১৯৮৩ সালে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। মুক্তির পর তিনি বিরজেইত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং টানা তিনবার ছাত্র পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন, যা ফাতাহ যুব আন্দোলনের প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে।
১৯৮৪ সালে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গ্রেপ্তার, ১৯৮৫ সালে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ, গৃহবন্দী এবং প্রশাসনিক আটকাদেশের শিকার হন। ১৯৮৬ সালে তাকে অনুসরণ করে গ্রেপ্তার ও নির্বাসিত করা হয়। এই সময় তিনি প্রয়াত নেতা খলিল আল-ওজির (আবু জিহাদ) এর সঙ্গে কাজ করেন এবং ১৯৮৯ সালে ফাতাহ বিপ্লবী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯৪ সালের এপ্রিলে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের পর তিনি ফিলিস্তিনে ফিরে আসেন এবং প্রয়াত ফয়সাল আল-হুসেইনির ডেপুটি ও পশ্চিম তীরে ফাতাহের সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। তিনি পশ্চিম তীরে ফাতাহ সংগঠন পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং ১৯৯৬ সালে ফাতাহর প্রতিনিধিত্বকারী আইন পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ষষ্ঠ ও সপ্তম সম্মেলনে আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটিতে যোগ দেন।
দ্বিতীয় ইন্তিফাদা ও গ্রেপ্তার
দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময়, যা তৎকালীন ইসরাইলি বিরোধী নেতা এরিয়েল শ্যারনের আল-আকসা মসজিদে হামলার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, বারঘৌতি ফাতাহর অন্যতম বিশিষ্ট নেতা ছিলেন। দখলদার কর্তৃপক্ষ তাকে ফাতাহর সামরিক শাখা আল-আকসা শহীদ ব্রিগেড প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত করে এবং হত্যাচেষ্টা চালায়।
২০০২ সালের ১৫ এপ্রিল ইসরাইলি বাহিনী রামাল্লাহর আল-ইরসাল পাড়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। দুই বছর পর ইসরাইলি আদালত তাকে আল-আকসা শহীদ ব্রিগেড প্রতিষ্ঠার অভিযোগে পাঁচটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং চল্লিশ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। সাজার পর তিনি বলেন, ‘যদি আমার জনগণের স্বাধীনতার মূল্য আমার স্বাধীনতা হারানো হয়, তাহলে আমি সেই মূল্য দিতে রাজি।’
বন্দিদশা ও শিক্ষা
গ্রেপ্তারের পর থেকে বারঘৌতি নির্জন কারাবাস ও নির্যাতনের শিকার হন। ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে মেগিদ্দো কারাগারে তাকে নির্মমভাবে আক্রমণ করা হয়, যাতে তিনি গুরুতর আহত হন। কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও তিনি হিব্রু ভাষা শেখেন এবং ২০১০ সালে হাদারিম কারাগারে অধ্যয়নরত অবস্থায় আরব রাষ্ট্রের লীগ গবেষণা ও অধ্যয়ন ইনস্টিটিউট থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
বারঘৌতি বন্দিদশায় একাধিক বই প্রকাশ করেন, যার মধ্যে ‘এক হাজার দিন নির্জন কারাবাস’ উল্লেখযোগ্য। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বন্দী বিষয়ক কর্তৃপক্ষের মতে, তিনি মোট ২৮ বছর ইসরাইলি কারাগারে কাটিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সম্ভাবনা
বারঘৌতি অন্যতম জনপ্রিয় ফিলিস্তিনি নেতা। মতামত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ইসরাইলি কারাগারে থাকলেও তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের রাষ্ট্রপতি পদের সম্ভাব্য প্রার্থী। ব্রিটিশ ওয়েবসাইট মিডল ইস্ট আই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা তার মুক্তি না দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তাদের বিশ্বাস, বারঘৌতির মুক্তি মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বের জন্য হুমকি হতে পারে। তবে ফাতাহ বন্দী বিনিময় চুক্তিতে তার মুক্তির বিরোধিতা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
মুক্তির দাবি
২০১৪ সালে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান লেখক মার্টিন লিন্টনের একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে, যেখানে বারঘৌতিকে ‘ফিলিস্তিনি নেলসন ম্যান্ডেলা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং তার মুক্তিকে ফিলিস্তিনি-ইসরাইলি শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলা হয়।
ইসরাইলি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বারঘৌতির পরিবার দোহায় গিয়ে বন্দী বিনিময় চুক্তিতে তাকে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে তার আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে। হিব্রু গণমাধ্যম জানায়, এই চুক্তির অংশ হিসেবে মুক্তি পেলে পরিবার তাকে তুরস্কে নির্বাসনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, যদিও এটি জনসমক্ষে অস্বীকার করা হয়। একইভাবে, পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইনের মহাসচিব আহমেদ সাদাতের পরিবারও হামাসকে একই ধরনের বার্তা পাঠায়।
সূত্র : আল জাজিরা মুবাশ্বির




