ফ্যাসিবাদ, হিন্দুত্ববাদ, সংস্কৃতি, সংস্কার, আওয়ামী লীগ, দিল্লি,

ফ্যাসিবাদ-উত্তর বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও রাষ্ট্র নির্মাণের রূপরেখা

দিপ্র হাসান

বিপ্লবের পর কিছু কাজ করতে চেয়েছিলাম। আমাকে সুযোগ দেয়া হয়নি। কারা সুযোগ পেয়েছে আপনারা জানেন। আমি কি করতে চেয়েছিলাম, কিভাবে চেয়েছিলাম তার একটা নমুনা আছে লেখাটায়। আগ্রহী হলে পড়তে পারেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে এক ভয়াবহ সময় পার করছে। বিগত যে কোন সময়ের তুলনায় এমনকি ফ্যাসিস্ট হাসিনার সময়ের তুলনায়ও আমরা এখন নাজুক অবস্থায় আছি। এই সময় থেকে উত্তরণ এবং বাংলাদেশকে একটি সুন্দর দেশে পরিণত করার জন্য আমাদের কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরাতিন ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিতে পারিঃ
১. স্বল্পমেয়াদী।
২. মধ্য মেয়াদী।
৩. দীর্ঘ মেয়াদী।

স্বল্পমেয়াদীঃ
ফ্যাস্টিস্টের পলায়নের পর আমাদের ইমিডিয়েট থ্রেট হল তার ফিরে আসা, তার রেখে যাওয়া পোষা কুকুরদের প্রতি-বিপ্লব করা, সেনা ক্যু, তার রেখে যাওয়া সব ঠিক রেখে শুধু নতুন শাসক বসানো ইত্যাদি। এই থ্রেট মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজন একটি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন করা। যেই কাউন্সিল দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে আমাদেরকে করণীয় সম্পর্কে জানাবে। নিরাপত্তা বাহিনীতে কর্মরত বাংলাদেশপন্থী মানুষেরা যার আলোকে দেশের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবেন।

মধ্যমেয়াদীঃ
ফ্যাসিবাদ আমাদের সকল সেক্টর ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। প্রতিটি সেক্টরকে পুনর্গঠনের জন্য সেক্টর অনুযায়ী আলাদা কমিশন গঠন করে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে আর্থিক ও ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন, প্রশাসন ও বিচার খাত পুনর্গঠনকে গুরুত্ব দিয়ে মধ্য মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদীঃ
সেই ষাটের দশক থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে ভারতীয় পরিকল্পকরা আমাদের অনেকের মানসিকতা ভারতের প্রতি গোলামী সুলভ করে দিয়েছে। আমাদের দেশপ্রেমও অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নের সম্মুখীন। জাতি হিসেবে স্বাধীনচেতা হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য আমাদের দরকার সাংস্কৃতিক আজাদী। এই জন্য আমাদের কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
১. ভারতীয় টিভি চ্যানেল, মুভি প্রদর্শন বন্ধ করা।
২. বিভিন্ন কোম্পানী কর্তৃক ভারতীয় সেলিব্রেটি আনয়ন বন্ধ করা
৩. আমাদের টিভিতে ভারতীয় সেলিব্রেটিদের তৈরি বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা
৪. বাংলাদেশ ও ভারতীয় বিভিন্ন কালচারাল গ্রুপের মধ্যে পরস্পরকে প্রমোট করার ব্যবস্থা বন্ধ করা
৫. ভারতীয় তাঁবেদারদের হাত থেকে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে মুক্ত করা।

ভারতীয় তাঁবেদারদের হাত থেকে সংস্কৃতিকে মুক্ত করাঃ
দীর্ঘদিনের চেষ্টায় আমাদের সংস্কৃতিকে তাঁবেদারদের অধীনে নিতে সক্ষম হয়েছে ভারত। এদের হাত থেকে বাংলাদেশের কালচারকে মুক্ত করার জন্য বাংলাদেশের সংস্কৃতি কারা নিয়ন্ত্রণ করছে তা জানতে হবে। একইসাথে অন্য কোন উপায়ে বাংলাদেশে ভারতীয় গোলাম তৈরি হয় তাও জানতে হবে।
১. সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়
২. বিভিন্ন কালচারাল ফেডারেশন
৩. ছায়ানট ও রবীন্দ্র চর্চা নামের বিভিন্ন সংগঠন।
৪. বামপন্থী সংগঠন
৫. ভারতীয় হাই কমিশন
৬. পীরতন্ত্র, তাবলীগ জামাত ও দেওবন্দ
৭. ভারতে শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভ্রমণ

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ঃ
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের বিভিন্ন কালচারাল ফেডারেশনভুক্ত দলগুলোকে প্রতি বছর ৪০,০০০/- থেকে শুরু করে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দেয়। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কালচারাল অঙ্গ সংগঠন যেমন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, উদিচি ইত্যাদি সংগঠন এবং জোটভুক্ত দলগুলো বর্তমানে এই অনুদানগুলো পেয়ে থাকে।

বাংলাদেশের সবগুলো শিল্পকলা একাডেমি থেকে ফ্যাসিবাদের আজ্ঞাবহ দালাল তাড়িয়ে জাতীয়তাবাদী অথবা ইসলামপন্থী সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়োগ দিতে হবে। শিল্পকলা এবং শিশু একাডেমির প্রশিক্ষকদের পরিবর্তন করে বাংলাদেশপন্থী প্রশিক্ষকদের নিয়োগ দিতে হবে। শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি এবং শিশু একাডেমির বিভিন্ন পদ থেকে ভারতীয় তাঁবেদারদেরকে বিতারিত করে বাংলাদেশপন্থী মানুষদের নিয়োগ দিতে হবে।

১. এ লক্ষ্যে একটা সার্চ কমিটি গঠন করে সারা দেশের সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ও প্রশিক্ষকদের তালিকা প্রণয়ন করে তাদেরকে এসব প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। তাদেরকে বিভিন্ন কালচারাল ফেডারেশনের অর্ন্তভুক্ত করতে হবে।

২. সারা দেশের হাজার হাজার পাঠাগারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে অনুদান দেয়া হয়। এই টাকাগুলোও আওয়ামীপন্থীদের পেটে যায়। এই গ্রন্থাগারগুলো তাদের হাত থেকে উদ্ধার করতে হবে। অথবা অনুদান বন্ধ করে দিতে হবে। অনুদানের টাকায় সারা দেশে বাংলাদেশপন্থী পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে।

৩. সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এখনো ফ্যাসিবাদের পারপাস সার্ভ করছে। তাই এই মন্ত্রণালয় থেকে ফ্যাসিবাদের দালালদের তাড়িয়ে বাংলাদেশপন্থী লোকজনকে নিয়োগ দিতে হবে।

বিভিন্ন কালচারাল ফেডারেশনঃ
আওয়ামী ফেডারেশনগুলো আমরা দালাল মুক্ত করতে পারব না। তাই আবৃত্তি, গান, নাটক, গণসঙ্গীত ইত্যাদির জন্য আলাদা জোট বা ঐক্য গড়ে সবগুলোকে বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্যের ব্যানারে নিয়ে আসতে হবে। শুধুমাত্র ফ্যাসিবাদের দালালদের বাদ দিয়ে অন্য সকল মত ও পথের সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে আমাদের নতুন ঐক্য গড়তে হবে। আমাদের সাথে যাতে ভোল পাল্টিয়ে ফ্যাসিবাদের দালালরা যুক্ত হতে না পারে সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে।

*সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের জোটভুক্ত দলের বাইরে যাতে আর কেউ না পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে।

* দুস্থ সংস্কৃতি কর্মীর অনুদানের তালিকায়ও যাতে ফ্যাসিবাদের কোন সমর্থক অনুদান না পায় সেটা দেখতে হবে। আমাদের দুস্থ কর্মীরা যাতে অনুদান পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে।

* পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তন, শিল্পকলা মিলনায়তনসহ বিভিন্ন মিলনায়তনে আওয়ামী জোটভুক্ত দলগুলো রেয়াতি হারে অনুষ্ঠান করতে পারে। তাদের সে সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে আমাদের জোটভুক্ত দলগুলো যাতে যাতে এই সুবিধা পেতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে।

কোন কোন দল অনুদান পাবে তা নির্ধারণ করে দেয় আওয়ামীপন্থী জোটগুলোর নেতারা। তাদের পরিবর্তে এই ক্ষেত্রে আমাদের জোটগুলোর নেতাদের নিয়ে আসতে হবে। যাতে বাছাইতে ওদের দলগুলো বাদ পড়ে এবং আমাদের দলগুলো অনুদান পায়।

ছায়ানটসহ বিভিন্ন রবীন্দ্র চর্চা কেন্দ্রঃ
এরা বাংলাদেশে ভারতীয় গোলাম তৈরি করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোয় অনুদান বন্ধ করে দিতে হবে। বিপরীতে নজরুল এবং ফররুখ চর্চা কেন্দ্র বাড়াতে হবে। ছায়ানটের মত প্রতিষ্ঠানও আমাদের গড়ে তুলতে হবে। সেখানে রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চা হলেও যাতে ভারতের গোলাম তৈরি না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

রবীন্দ্রনাথের নামে কয়েকটি বিশ^বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে। এগুলোর শিক্ষক এবং কারিকুলাম বদলাতে হবে। প্রয়োজনে বিশ^বিদ্যালয়ের নামও বদলাতে হবে।

বামপন্থী সংগঠনঃ
সেই পাকিস্তান আমল থেকেই বাংলাদেশে ভারতীয় স্বার্থের সবচেয়ে বড় পাহারাদার বামপন্থীরা। সর্বশেষ রামপাল বিরোধী আন্দোলনের নামে বামপন্থী আনু মোহাম্মদ ও কল্লোল মোস্তফারা ঠিকই রামপালে ভারতীয় কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের সুযোগ করে দেয়। এরা সব সময় এমনভাবে আন্দোলন করে যাতে সেই আন্দোলনগুলো করে বাংলাদেশের অন্য কোন দল জনপ্রিয়তা অর্জন করতে না পারে। এই কারণে তাদের সূচনা করা আন্দোলন যৌক্তিক হলেও অন্য দলগুলোকে তারা যুক্ত হতে বাধা দেয়। তারা মূলত সমস্যার সমাধান চায় না। তারা চায় সমস্যা জিইয়ে রেখে নিজেদের প্রচার। আর ভারত বিরোধী আন্দোলন হলে তারা কুসুম কুসুম আন্দোলন করে ভারতীয় স্বার্থ রক্ষা করে।

বামপন্থীরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পহেলা বৈশাখ ইত্যাদির সময় ভারতীয় সংস্কৃতির ব্যাপক প্রদর্শন করে থাকে। চারুকলাসহ যেসকল প্রতিষ্ঠানের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে ওরা এই কাজগুলো করে থাকে সেখানে আমাদের ছাত্রদের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে হবে। যাতে চারুকলা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের না হয়ে বৈশাখী মিছিল বের হয়। যে মিছিলে ভারতী প্যাঁচা, ময়ুর ইত্যাদির পরিবর্তে থাকবে লাঙ্গল, জোয়াল, পলো, কুলাসহ গ্রাম বাংলার জীবনাচারের বিভিন্ন উপাদান।

ভারতীয় হাই কমিশনঃ
ভারতীয় হাই কমিশন প্রায়ই বিভিন্ন সংগঠনে অর্থায়ন করে থাকে। প্রতি বছর ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার কয়েক হাজার মানুষকে তারা ফ্রিতে ভারতে ঘুরতে নেয়। অনেককে ফ্রি ট্রেনিং দেয়। এই কাজের মাধ্যমে তারা ভারতীয় গোলাম তৈরি করে। তাদের এই কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে হবে।

পীরতন্ত্র, তাবলীগ জামাত ও দেওবন্দঃ
বাংলাদেশে ভারতের অনুগত মানুষ তৈরিতে জৈনপুর, আজমীর, তাবলীগ জামাত, দেওবন্দসহ এ জাতীয় বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেরও যথেষ্ঠ ভূমিকা আছে। বাংলাদেশের ইসলামী চিন্তাবিদদের এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। যারা ভারতে যাবে তাদেরকে যেন এ ব্যাপারে যথেষ্ঠ মোটিভেশন দেয়া হয়।

ভারতে শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভ্রমণঃ
দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনীতির নামে মারামারি লেগে থাকায়, দলীয় বিবেচনায় অযোগ্য লোকদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ায় প্রতি বছর প্রচুর ছেলে মেয়ে ভারতে লেখাপড়া করতে যায়। তারা ওখান থেকে ভারতের প্রতি সফট কর্নার নিয়ে দেশে ফেরে। বাংলাদেশী ছাত্রদের ভারতে গমন রোধ করার জন্য বাংলাদেশের সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অযোগ্য শিক্ষকদের তাড়াতে হবে। নতুন করে মেধাবী এবং যোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। গত পনের বছরের সকল নিয়োগ রিভিউ করে অনেক অযোগ্য শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে হবে।

বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর পেশাদারিত্বহীনতা, অনুন্নত ব্যবস্থাপনা, প্রচারের অভাব ইত্যাদি কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ লোক ভারতে চিকিৎসার জন্য যায়। ভারতের চিকিৎসাপ্রার্থী মানুষের ¯্রােত থামানোর জন্য আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাউন্নত করার বিকল্প নাই। এ লক্ষ্যে সকল ডাক্তার এবং রোগীর ডাটাবেজ অনলাইন করে ফেলা দরকার। যাতে রোগীর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সকল তথ্য একটা ইউনিক আইডির আওতায় থাকবে। এতে করে কোন ডাক্তার ভুল ট্রিটমেন্ট করার সাহস পাবে না। চিকিৎসা ব্যবস্থাও উন্নত হবে। রোগীর নামে একটা কার্ড ইস্যু করা হবে। শুধুমাত্র ওই কার্ড ব্যবহার করে এই তথ্য একসেস করা যাবে।

আমাদের দেশের পর্যটন এরিয়াগুলোতে সিন্ডিকেট, সুযোগের অভাব, অপর্যাপ্ত যোগাযোগ, খরচ বেশি হওয়া ইত্যাদি কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক ভারত ভ্রমণে যায়। আমাদের চেয়ে ভারতে দেখার মত জায়গা বেশি হওয়ায় এই স্রোত বন্ধ করা হয়ত যাবে না। তবে আমাদের পর্যটন খাত উন্নত এবং সাশ্রয়ী করে অনেকটাই এই স্রোত কমিয়ে দেয়া সম্ভব। তাছাড়া আমাদের অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গার প্রচার হয় না সেভাবে। তাই অনেকেই সেই জায়গাগুলো ঘুরতে যায় না। বান্দরবান আমাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হওয়ার পরও দীর্ঘদিন এখানে উন্নত পর্যটন গড়ে তোলা যায়নি। বিশেষ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত কিছু সংগঠনের কারণে অনেক পর্যটক এখানে ঘুরতে যেতে পারে না। পাহাড়ের সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান করে পুরো পাহাড়ি এলাকাকে পর্যটনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

উত্তরণের উপায়ঃ নিজস্ব সংস্কৃতির উন্নয়ন
মানুষকে বাধা দিয়ে কোন কিছু থেকে এখন বিরত রাখা যায় না। মানুষকে কোন কিছু থেকে বিরত রাখার শ্রেষ্ঠ উপায় হল বেটার বিকল্প উপস্থাপন। ভারতীয় মুভি, সিরিয়াল, বই, ইউটিউব ইত্যাদি থেকে দেশের মানুষকে বিরত রাখতে চাইলে আমাদের অবশ্যই এসবের চেয়ে ভাল বিকল্প তৈরি করতে হবে। ভারতে চিকিৎসা, ভ্রমণ এবং শিক্ষার বিকল্পও আমাদের গড়তে হবে।এইজন্য সঠিক পরিকল্পনার আওতায় আমাদেরকে বিনিয়োগ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সংস্কৃতি দখলের মাধ্যমেই এ দেশে ভারতীয় ফ্যাসীবাদ এতটা শিকড় গেড়ে বসতে পেরেছিল। তাই এই সেক্টরকে অবশ্যই অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে।

মূল ধারার কালচারাল সংগঠন পরিচালনাঃ
০১. নাটক, গান, নাচ, আবৃত্তি ইত্যাদির মূল ধারার হাজার হাজার সংগঠন আছে দেশে। এই সংগঠনগুলো বন্ধ করতে চাইলে তাদের ক্ষোভ বাড়তে থাকবে। যা এক সময় আমাদের জন্য মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই এই সংগঠনগুলোকে বিভিন্ন ফেডারেশনের আওতায় এনে, সংগঠনগুলোতে নতুন চিন্তার বিকাশ ঘটিয়ে এগুলোকে নতুন বাংলাদেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে হবে।

০২. বাংলাদেশে ইসলামী ঐতিহ্যের উপর নাটক সিনেমা নাই বললেই চলে। বাংলাদেশে যখন ইসলামের আগমন ঘটে তখন মানুষ কিভাবে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে মুক্তির কারণে মুসলিম বিজেতাদের স্বাগত জানিয়েছিল তার উপর নাটক সিনেমা বানানো যেতে পারে। এক্ষেত্র শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন উপন্যাস, আসকার ইবনে সাইখ, নুরুল মোমেন প্রমুখের নাটক অবলম্বনে নয়া স্ক্রিপ্ট তৈরি করা যেতে পারে।

০৩. শিল্পকলা, শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, জাদুঘর ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে মূল ধারার সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে বেগবান করার ক্ষেত্রে আমাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

০৪. প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের নেতৃত্বে নতুন ধারার কালচারাল সংগঠন তৈরি করা। পুরনো কালচারাল সংগঠনের বিকল্প হতে পারে এই সংগঠনগুলো।

০৫. সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন। বাংলাদেশের কালচারাল জগত মূলত রবীন্দ্র ভারতী বা শান্তি নিকেতন থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে আসা কালচারাল ব্যক্তিত্বদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই দুইটি প্রতিষ্ঠানের বিকল্প দেশীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে সেখানে বাংলাদেশী সংস্কৃতির উন্নয়নে যুগোপযোগী সিলেবাস পড়ানো যেতে পারে। সাউথ কোরিয়ার মডেলে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ঢেলে সাজাতে পারি। তাহলে ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন অনেকটাই দূর করতে পারব।

০৬. ভারতীয় টিভি চ্যানেল, সিনেমা, ইউটিউব চ্যানেল ইত্যাদি থেকে মানুষ যাতে মুখ ফিরিয়ে নেয় সেই চেতনাবোধ জাগ্রত করতে হবে। প্রয়োজনে কিছু ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে। ভারতীয় পণ্যের চাহিদা তৈরি হয় এমন সব ধরনের প্রচার বন্ধ করতে হবে।

০৭. জাতি গঠনের মূল উপাদান হল পারস্পরিক সম্প্রীতি। এই বিষয়টা নিশ্চিত করার জন্য সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাজ করতে হবে। একই সাথে সমাজে যাতে অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা জাগরুক থাকে তার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
এক সময় সুদ ঘুস ব্যভিচার খুন দুর্নীতি ইত্যাদি অপকর্ম করা লোকজনকে খারাপ চোখে দেখা হত। ফলে এই জাতীয় কাজগুলোর মহামারি রকমের উপস্থিতি ছিল না। কিন্তু বিগত দিন সমূহে এই কাজগুলোকে ক্ষমতার সাথে জুড়ে দিয়ে মহিমান্বিত করা হয়েছে। যা জাতির চরিত্রকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য কালচারাল কর্মীদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

০৮. টিভি এবং বেতারে প্রচুর অনুষ্ঠান করতে হবে।

০৯. নৈতিকতা সম্পন্ন সিনেমা বানাতে হবে।

১০. প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাংস্কৃতিক আন্দোলন পৌঁছে দিতে হবে। চর, পাহাড়, নদী ভাঙন প্রবণ এলাকার মানুষদেরকেও খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করে দেয়া।

১১. মাদক এখন অনেক বড় সমস্যা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে গত পনের বছরে মাদকের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। সুদী কারবারেও আটকে গেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তর। এলাকার আলেমদের সাথে নিয়ে এই বিষয়গুলো নিয়েও কাজ করতে হবে সংস্কৃতিসেবীদের।

১২. বিভিন্ন জাতীয় উৎসবে আমাদের সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা থাকতে হবে চোখে পড়ার মত। মোঙ্গল শোভা যাত্রার বিপরীতে বারাকাহ শোভা যাত্রা, পলাশী দিবসে সাংস্কৃতিক উৎসব, ১৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক উৎসব করতে হবে। ২১শে ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা পৌত্তলিকতা থেকে জাতিকে বের করে আনার চেষ্টা করতে গেলে নতুন করে সংকট তৈরি হবে। তাই এর বিপরীতে আমরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে মানুষজনকে সেদিকে আকৃষ্ট করতে পারি।

১৩. পহেলা বৈশাখ আমাদের আসল নববর্ষের দিন নয়। আমাদের নববর্ষের দিন পহেলা অগ্রহায়ণ। আমরা সেদিকে ফিরে যেতে পারি। দিনটি উৎসবের জন্যও আদর্শ। বৈশাখের ঝড়ের মধ্যে উৎসব করা অনেক বেশি অমানবিক। তাই আমরা যদি পহেলা অগ্রহায়ণে উৎসব করা শুরু করি তাহলে আমরা যে রঙে উৎসব করব সেটাই কালচার হয়ে যাবে। তাই বাঙালির আদি নববর্ষ নাম দিয়ে আমরা এদিনটি উদযাপন করতে পারি। একই সাথে বাংলা নববর্ষের গণণা যেন আবার এদিনকে কেন্দ্র করে শুরু হয় তার জন্য প্রচারণা চালাতে পারি।

১৪. আমাদের পোশাক ভাবনাও অনেক বেশি বিতর্কিত। পাজামা পাঞ্জাবী আমাদের জাতীয় পোশাক। অথচ অনেক অফিসে পাজামা পাঞ্জাবি নিষিদ্ধ। আমাদের জাতীয় পোশাক নির্ধারণ নিয়েও ভাবতে হবে। লুঙ্গি এবং ফতোয়াকে আমাদের জাতীয় পোশাক করা যেতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে শাড়ি। আমরা ওয়েস্টার্ন পোশাককে এভাবে গ্রহণ করছি বলে সমাজে ধীরে ধীরে ওয়েস্টার্ন কালচারের প্রভাব পড়ছে।

১৫. আওয়ামীতন্ত্র বিলোপ। এই কাজটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, অর্থনীতি, বিচার ব্যবস্থা, রাজনীতি ইত্যাদি থেকে আওয়ামীতন্ত্র বিলোপ করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। কালচারাল একটিভিটিজের মাধ্যমে এই কাজটির আবশ্যকীয়তা ফুটিয়ে তুলতে হবে। যাতে বাংলাদেশে আর কখনো ফ্যাসিবাদের উত্থান না হয়। এক্ষেত্রে আমরা জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ডিনাজিফিকেশন মডেল ফলো করতে পারি। সেখানে সমাজ, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, অর্থনীতি, বিচার ব্যবস্থা এবং রাজনীতি থেকে নাজিবাদ দূর করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল।

১৬. হিন্দুত্ববাদ মোকাবেলা। আমাদের আদি ও আসল শত্র“ হিন্দুত্ববাদ। এই হিন্দুত্ববাদের তত্বই হল অখন্ড ভারত। বাংলাদেশকে ভারতের অধীনে নেয়ার প্রকল্প তাদের অনেক পুরানা। এইটাকে মাথায় রেখে আমাদের কাজ করতে হবে।

১৭. বাংলা ক্যালেন্ডার সংস্কার। আমরা এখনো দিল্লীর চাপিয়ে দেয়া ক্যালেন্ডার ফলো করছি। এটা থেকেও আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

লেখকের ফেসবুক থেকে গৃহীত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top