শায়খ ইবনুল কালাম
বাল্য অর্থ ছেলেবেলা, বালকবয়স, ষোল বৎসর বয়স পর্যন্ত জীবনকাল। বাল্যবিবাহ অর্থ বাল্যকালে বা অপরিণত বয়সে বিবাহ। (সংসদ বাংলা অভিধান; পৃষ্ঠা ৪২৫)
বাল্য অর্থ ষোলো বৎসর বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সময়। বাল্য বিবাহ অপরিণত বয়সে কৃত পরিণয়। (ব্যবহারিক বাংলা অভিধান; পৃষ্ঠা : ৮৬২)
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৩ (খসড়া) ২ নং ধারার (গ) য়ে বলা হয়েছে ‘বাল্যবিবাহ’ অর্থ সেই বিবাহ যাহাতে সম্পর্ক স্থাপনকারী পক্ষদ্বয়ের যে কোনো একজন নাবালক।
এখানে আপাতত তিনটি বিষয়ে কিছু কথা বলার ইচ্ছা রাখি। এক. কুরআন-সুন্নাহর বিধানের আলোকে বিয়ের বয়স। দুই. কুরআনের বিধানের যৌক্তিকতা ও যথার্থতা এবং তিন. অন্যান্য মতামতের পর্যালোচনা।
এক. কুরআন-সুন্নাহর বিধানের আলোকে বিয়ের বয়স
ছেলে-মেয়ের বিয়ের বয়স সম্পর্কে ইসলামী নীতি ও বিধানের সারকথা হচ্ছে, ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে, এমনকি সাবালক হওয়ার আগেও মেয়েকে বিয়ে দেয়ার অবকাশ রয়েছে; তবে বিনা কারণে অতি অল্প বয়সে ছেলে-মেয়ের বিয়ে শাদীকে শরীয়ত উৎসাহিত করে না।
এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজীদের সূরা তালাক (সূরা নং ৬৫)-এর ৪ নং আয়াতটি প্রাসঙ্গিক। ইরশাদ হয়েছে-
وَ الّٰٓـِٔیْ یَىِٕسْنَ مِنَ الْمَحِیْضِ مِنْ نِّسَآىِٕكُمْ اِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلٰثَةُ اَشْهُرٍ وَّ الّٰٓـِٔیْ لَمْ یَحِضْنَ وَ اُولَاتُ الْاَحْمَالِ اَجَلُهُنَّ اَنْ یَّضَعْنَ حَمْلَهُنَّ وَ مَنْ یَّتَّقِ اللهَ یَجْعَلْ لَّهٗ مِنْ اَمْرِهٖ یُسْرًا .
তোমাদের যে সকল নারীর আর ঋতুমতী হওয়ার আশা নেই তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করলে তাদের ইদ্দত হবে তিনমাস, এবং যারা এখনো রজঃস্বলা হয়নি।…-সূরা তালাক (৬৫) : ৪
আয়াতের উদ্ধৃত অংশে তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত উল্লেখিত হয়েছে। বলা হয়েছে যে, তালাকপ্রাপ্তা নারী যার বয়স হওয়ার কারণে ঋতু¯্রাব বন্ধ হয়েছে এবং যার প্রাপ্তবয়স্কা না হওয়ার কারণে ঋতু শুরুই হয়নি, উভয়ের ইদ্দত তিন (চান্দ্র) মাস। অর্থাৎ উদ্ধৃত আয়াত প্রমাণ করছে যে, ঋতুমতী হওয়ার আগেও একটি মেয়ের বিয়ে হতে পারে এবং তালাকও হতে পারে।
নবী-যুগে অল্প বয়সে বিয়ের একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রা.-কে যখন বিয়ে করেন তখন তার বয়স ছিল ছয় বা সাত বছর। রোখসোতির সময় বয়স ছিল আট বা নয়। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) আর এ বিষয়ে উম্মাহর ফকীহ ও মুজতাহিদগণের ইজমাও রয়েছে। (আহকামুল কুরআন)
সুতরাং কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মতের ভিত্তিতে এই বৈধতা ও অবকাশ প্রমাণিত। তবে আবারও বলছি ইসলামে সাধারণ অবস্থায় অপরিণত বয়সের বিয়েকে উৎসাহিত করা হয়নি। প্রতিবেশী নানা ধর্ম ও মতবাদের সাথে ইসলামের পার্থক্য এখানেই। ইসলাম বাল্য-বিবাহকে উৎসাহিত বা নিয়মে পরিণত করেনি আবার সর্বাবস্থায় চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধও করেনি।
দুই. কুরআনের বিধানের যৌক্তিকতা ও যথার্থতা
ইসলামের এই প্রশস্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ বিধানের যথার্থতা অতি স্পষ্ট। বিচিত্র প্রয়োজন ও সংকটের ক্ষেত্রেও এ বিধান পালনযোগ্য।
যেমন কোনো ছেলে-মেয়ের মাঝে ১৮ বছরের আগেই প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠল। এখন যদি তাদেরকে বিবাহের মাধ্যমে বৈধ উপায়ে মেলামেশার সুযোগ না দেয়া হয়, তাহলে তারা অবৈধভাবে মিলিত হবে। এতে চারিত্রিক অবক্ষয় সৃষ্টি হবে এবং সমাজে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।
এমনিভাবে কখনো দেখা যায় যে মেয়ে পক্ষ এলাকার প্রভাবহীন পরিবার। তাদের মেয়েকে প্রভাবশালী পরিবারের বখাটে ছেলেরা উত্যক্ত করে। আইন-আদালতের আশ্রয় নিয়ে যাদেরকে থামানো এমন পরিবারের পক্ষে সম্ভবপর নয়। সেক্ষেত্রেও তো ১৫ বছরের আগে তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া পরিবারের জন্য নিরাপদ। এক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করলে এই নারীর জীবন একদিকে দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। অপরদিকে তার সম্ভ্রমহানিরও আশঙ্কা থেকে যায়।
কখনো এমন হয়, মৃত্যুপথযাত্রী পিতা তার একমাত্র নাবালেগ কন্যাকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে যেতে চান। তখন তাকে সম্মানজনক উপায়ে রাখার অন্যতম উপায় হতে পারে এই বাল্যবিবাহ। এখন বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ হলে বাবা নিশ্চিন্তচিত্তে পরপারে পাড়ি জমাতে পারবেন না।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গরীব বাবা-মায়ের আর্থিক সঙ্কট কাটানোর জন্য মেয়েকে যথাপোযুক্ত পাত্রের কাছে পাত্রস্থ করারও প্রয়োজন দেখা দিতে পারে; বাল্যবিবাহের অনুমতি থাকলে এই সঙ্কট থেকে বের হওয়া সহজ হবে।
সুতরাং কেবল আইন করলেই হবে না। বরং আইনের কারণে কোনো সঙ্কট থাকলে তার থেকে উত্তরণের উপায়ও রাখতে হবে। সেজন্য ইসলাম বাল্য বিবাহকে উৎসাহিত করে না। তবে সঙ্কট সমাধানের সুযোগ হিসেবে দেখে।
তিন. নারীবাদীদের মতামতের পর্যালোচনা
নারীবাদীরা বলেন, বাল্য-বিবাহ (অর্থাৎ আঠারোর আগে বিয়ের) অনুমতি দেয়া হলে মেয়েদের উপর পারিবারিক সহিংসতা বাড়বে। অর্থাৎ এদের মতে আঠারো সংখ্যাটি এমন এক কারিশম্যাটিক সংখ্যা যে, তা পূরণ করা মাত্র সকল পারিবারিক সহিংসতা কর্পূরের মতো উবে যাবে। অথচ বর্তমানে পরিবারিক সহিংসতার দৃষ্টান্তগুলোর সিংহ-ভাগই এমন যাতে সহিংসতাকারী ও সহিংসতার শিকার উভয়েরই বয়স আঠারোর উপরে। সুতরাং যুক্তি ও বাস্তবতার বিচারেও এগুলো খুবই হাস্যকর কথা। এই সহজ কথা তো একজন সাধারণ মানুষও বোঝেন যে, পারিবারিক সহিংসতাসহ সবরকমের যুলুম-অত্যাচার দূর করার উপায় হচ্ছে মনুষ্যত্ব ও মানবীয় গুণাবলীর বিকাশ এবং আইনের যথার্থ প্রয়োগ। সুতরাং একদিকে ব্যাপক ঈমানী ও দাওয়াতী তৎপরতা অন্যদিকে যথার্থ আইন ও তার প্রয়োগের মাধ্যমেই এই সহিংসতা প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
বাল্য বিবাহে ইসলামের দিক-নির্দেশনা
ইসলামে সাধারণ অবস্থায় অপরিণত বয়সের বিয়েকে উৎসাহিত বা নিয়মে পরিণত করেনি। আবার সর্বাবস্থায় চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধও করেনি। বরং বিচিত্র প্রয়োজন ও সঙ্কটে এ বিধান পালনযোগ্য। তবে তার জন্যও বিভিন্ন শর্ত বেঁধে দিয়েছে। এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করছি।
ইসলাম পাত্র-পাত্রীর অভিভাবককে প্রয়োজনে বাল্য বিবাহ প্রদানের অনুমতি দিয়েছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে পাত্রের অভিভাবক হলেন এমন ব্যক্তি, যার সাথে পাত্রীর রক্তের সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি পাত্রীর কল্যাণ কামনায় উত্তীর্ণ। এমন অভিভাবক প্রয়োজন মনে করলে পাত্রীকে বাল্য বিবাহ দিতে পারবেন এবং পাত্রী ওই বিবাহ মেনে নিতে বাধ্য থাকবে।
প্রধান অভিভাবক হতে হলে পাত্রীর সাথে রক্তের সম্পর্ক ও কল্যাণ কামনায় উত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি আরো দুটি গুণ থাকতে হবে। তা হলো পরিপক্ক সমঝ ও পরিপূর্ণ স্নেহ-মমতা। এই চারটি গুণ যার মাঝে থাকবে, শরীয়তের দৃষ্টিতে তিনি পাত্রীর প্রধান শ্রেণির অভিভাবক। অর্থাৎ এই জাতীয় অভিভাবক মেয়েকে বাল্য বিবাহ দিলে এই বিয়ে ভঙ্গ করার সুযোগ থাকবে না।
আর যার মাঝে এই চার গুণের কোনোটিতে ঘাটতি রয়েছে, শরীয়ত তাকে দ্বিতীয় শ্রেণির অভিভাবক হিসেবে গণ্য করে। অর্থাৎ এরা প্রধান শ্রেণির অভিভাবকের অবর্তমানে পাত্রীকে বিবাহ দিতে পারবে। তবে পাত্রী সাবালক হওয়ার পর এই বিবাহ ভাঙ্গবার অধিকার প্রাপ্ত হবে। এই অধিকারকে ফিকহের পরিভাষায় খিয়ারুল বুলুগ বলা হয়ে থাকে।
শরীয়ত মনে করে, প্রধান শ্রেণির অভিভাবক হলেন মেয়ের বাবা ও দাদা। আর দ্বিতীয় শ্রেণির অভিভাবক হলেন মেয়ের মা, খালা, ফুফু, বোন ইত্যাদি।
সুতরাং বাবা কিংবা দাদা যদি পাত্রীকে উপযুক্ত পাত্রের হাতে বাল্যকালেই পাস্ত্রস্থ করে, তাহলে এই বিবাহ আবশ্যকীয় হয়ে যাবে। এটিকে আর ভঙ্গ করার সুযোগ নেই। কারণ, শরীয়তের বিশ্বাস- বাবা কিংবা দাদা পাত্রীর ক্ষতি হয়, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। অবশ্য যদি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে বাল্যবিবাহ দেয়ার সময় বাবা কিংবা দাদা পাত্রীর কল্যাণকামিতা লক্ষ্য করেননি, বরং ভিন্ন কোনো স্বার্থে তাকে বিয়ে দিয়েছেন, তাহলে সেক্ষেত্রে পাত্রী সাবালক হওয়ার পর এই বিবাহ ভেঙ্গে দেয়ার অধিকার প্রমাণিত হবে।
আর যদি বাবা ও দাদা ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবক (মা, খালা, বোন ও ভাই ইত্যাদি) পাত্রীকে বাল্যকালে পাস্ত্রস্থ করে, তাহলে বিবাহ তো আবশ্যকীয় হয়ে যাবে। তবে এই পাত্রী যখন সাবালক হবে, তখন তার খিয়ারুল বুলুগ প্রমাণিত হবে। সুতরাং সে চাইলে বিবাহ বলবৎ রাখতে পারবে। ইচ্ছে করলে বিবাহ ভেঙ্গেও দিতে পারবে।
বাবা ও দাদা ভিন্ন অন্য কেউ বাল্য বিবাহ দিলে খিয়ারুল বুলুগ প্রমাণিত হয়। কারণ, শরীয়ত মনে করে, বাবা ও দাদার মধ্যেই চূড়ান্ত পর্যায়ের স্নেহ-ভালোবাসা থাকে। তাদের থেকে বেশি কারো মধ্যে থাকে না। সেজন্য অন্য কেউ বিয়ে দিলে স্নেহের ঘাটতির একটা সন্দেহ থেকেই যায়। আর ওই সন্দেহ দূর করার জন্য এবং পাত্রীর যেন কোনোভাবেই হক নষ্ট না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য পাত্রীকে এই অধিকার দেয়া হয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে যে পাত্রী যে মজলিসে সাবালক হবে অর্থাৎ যখন তার প্রথম হায়েজ দেখা দিবে, তখনই তাকে এই বিবাহ ভেঙ্গে দিতে হবে। যদি ওই মজলিসেই ভঙ্গ না করে, তাহলে পাত্রী আর খিয়ারুল বুলুগ পাবে না।
অবশ্য সাবালক হওয়ার আগে যদি পাত্রী বিয়ের বিষয়ে অবহিত না থাকে, তাহলে যখন সে বিবাহের কথা জানতে পারবে, যেই মজলিসে জানবে, সেখানেই এই বিয়েকে ভেঙ্গে দিতে হবে। অন্যথায় খিয়ারে বুলুগ থেকে বঞ্চিত হবে। সূত্র : উমদাতুর রিওয়ায়াহ,৩ : ৭৫
যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮ রাজ্যে বাল্যবিবাহ আইনত অনুমোদিত
যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮ রাজ্যে ২০২৫ সালের এই সময় পর্যন্ত বাল্যবিবাহ আইনত অনুমোদিত। তবে এর মধ্যে ৩৪টি রাজ্যে আদালত ও অভিভাবকের অনুমতিসহ আরো কিছু শর্ত করা হয়েছে। বাকি চারটিতে এই শর্তেরও দরকার নেই।
শর্তসাপেক্ষে বাল্যবিবাহ বৈধ, এমন রাজ্যগুলো হলো, আলাবামা, আলাস্কা, অ্যারিজোনা, আরকানসাস, ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, হাওয়াই, আইডাহো, ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা, আইওয়া, ক্যানসাস, কেনটাকি, লুইসিয়ানা, মেরিল্যান্ড, মিসিসিপি, মন্টানা, নেব্রাস্কা, নেভাদা, নিউ মেক্সিকো, নর্থ ক্যারোলিনা, নর্থ ডাকোটা, ওহিও, ওকলাহোমা, সাউথ ক্যারোলিনা, সাউথ ডাকোটা, টেনেসি, টেক্সাস, উটাহ, পশ্চিম ভার্জিনিয়া, উইসকনসিন, ওয়াইমিং।
আর চারটি রাজ্যে বাল্যবিবাহের ন্যূনতম বয়সসীমা নেই। আদালত কিংবা অভিভাবকেরও অনুমতি থাকলে খুব অল্প বয়সেও বিয়ে সম্ভব। সেগুলো হলো, ক্যালিফোর্নিয়া, মিসিসিপি, নিউ মেক্সিকো, ওকলাহোমা।
উল্লেখ্য, বাল্যবিবাহ বলতে ১৮ বছরের কম বয়সের বিবাহকে বুঝানো হয়। এক্ষেত্রে অনেক রাজ্যে ১৬ বছর বয়সে বিবাহকেও বাল্য বিবাহ গণ্য করছে। তো অনেক রাজ্যে ১৬ বছর বয়সের বিবাহকে বৈধতা দিচ্ছে। আবার কোনো কোনো রাজ্য বয়সের কোনো সীমা রাখছে না।
(এই আলোচনাটুকু উইকিপিডিয়ার Child marriage in the United States থেকে নেয়া হয়েছে।)
বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের বাল্যবিবাহ
বাংলা ও ভারতীয় উপমহাদেশে বাল্যবিবাহ একসময় বহুল প্রচলিত ছিল। খ্যাতিমান বহু ব্যক্তিত্ব খুব অল্প বয়সেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন।
১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনেও এর স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। তিনি ২২ বছর বয়সে যশোরের দক্ষিণ ডিহি গ্রামের ভবতারিনী দেবীকে বিয়ে করেন, তখন ভবতারিনীর বয়স ছিল মাত্র ১০/১১ বছর। শুধু তাই নয়, কবি তার কন্যাদেরও অল্প বয়সেই বিয়ে দেন।
বড় মেয়ে মাধবীলতা বেলা যখন ১৪ বছরে, তখন তাকে ২৯ বছর বয়সী শরৎ চক্রবর্তীর সাথে বিবাহ দেন।
দ্বিতীয় কন্যা রেনুকা মাত্র ১১ বছর বয়সেই বিয়ের জন্য নির্ধারিত হয়েছিলেন এবং কনিষ্ঠ কন্যা মীরা ১৩ বছর বয়সে বিবাহিত হন।
রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও কিশোর বয়সে বিয়ে করেছিলেন; তাঁর বয়স তখন ছিল ১৪/১৫ বছর, আর কনের বয়স মাত্র ৬।
২. সমাজসংস্কারক শিবনাথ শাস্ত্রী
সমাজসংস্কারক শিবনাথ শাস্ত্রী ১২/১৩ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন, তখন তার স্ত্রীর বয়স ছিল ১০।
৩. শিক্ষাবিদ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
শিক্ষাবিদ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৪ বছর বয়সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল মাত্র ৮।
৪. সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১১ বছর বয়সে বিয়ে করেন, কনের বয়স ছিল মাত্র ৫।
৫. সমাজচিন্তক রাজনারায়ণ বসু
সমাজচিন্তক রাজনারায়ণ বসু ১৭ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন ১১ বছর বয়সী কন্যাকে।
৬. জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুর
একইভাবে, জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯ বছর বয়সে বিবাহ করেন মাত্র ৮ বছর বয়সী কনেকে।
৭. সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৭ বছর বয়সে বিবাহ করেছিলেন ৭ বছরের কন্যাকে।
৮. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
রাজনীতির ইতিহাসেও বাল্যবিবাহের উদাহরণ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন, তিনি ১২/১৩ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে, যিনি তখন মাত্র ৮ বছরের কন্যা।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, বাংলার সামাজিক ইতিহাসে বাল্যবিবাহ ছিল স্বীকৃত প্রথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র কিংবা শেখ মুজিবুর রহমান—সবার জীবনেই এ প্রথার প্রতিফলন ঘটেছে।
লেখক : আলেম ও গবেষক




