বিপুল জনবল ক্ষতির মধ্যেও রাশিয়ার সেনা পুনর্গঠন

ইউক্রেন যুদ্ধের তৃতীয় বছরে প্রবেশ করলেও রাশিয়া এখনও তার সামরিক বাহিনীকে বিপুল হারে পুনর্গঠন করে চলেছে। বিপুল হতাহতের পরও দেশটি নানা কৌশল, আর্থিক প্রণোদনা ও সামাজিক চাপে সেনা সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে।

২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু হলে, মস্কোর তরুণ ইভান চেনিন নিজের ছাত্রজীবন ছেড়ে ডোনেটস্ক ও লুহানস্কের বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যান। পরবর্তীতে তিনি থান্ডার ক্যাসকেড নামে একটি স্বেচ্ছাসেবক ইউনিটে যোগ দিয়ে ড্রোন অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি জানান, শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করে তথ্য সরবরাহ করার পর কামান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনা হতো।

চেনিন হলেন সেই অর্ধ মিলিয়ন রাশিয়ানের একজন, যারা গত বছর চুক্তিভিত্তিক সৈনিক বা স্বেচ্ছাসেবক ইউনিটে যোগ দেন। মার্চে পুতিন দাবি করেন, রাশিয়া ইউক্রেনের তুলনায় দ্বিগুণ হারে সেনা সংগ্রহ করছে। কিয়েভের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ২০২৪ সালের মধ্যে ইউক্রেনে ১.৫ লাখ অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে।

হতাহতের সংখ্যা হ্রাস

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমান করেছে, যুদ্ধে ১০ লক্ষাধিক রুশ সেনা নিহত বা আহত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষয়ক্ষতি কমছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ওলেগ ইগনাটভ জানান, রাশিয়া ভারী সরঞ্জামের ব্যবহার সীমিত করেছে এবং ছোট ছোট দলে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে, যা হতাহতের সংখ্যা কমিয়েছে।

নিয়োগের নতুন ধারা

যুদ্ধের প্রথম দিকে বহু তরুণ বিদেশে পালিয়ে গেলেও এখন চাপ অনেকটা কমেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে থেকে নতুন করে বাধ্যতামূলক সেনা সংগ্রহ হয়নি। তবে চুক্তিভিত্তিক সেনা নিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অসাধু নিয়োগকারীরা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে জোরপূর্বক চুক্তিতে স্বাক্ষর করাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আর্থিক প্রণোদনাও বড় ভূমিকা রাখছে। নতুন সৈন্যদের জন্য প্রায় ৫ হাজার ডলার বোনাস, মাসিক কমপক্ষে ২,৫০০ ডলার বেতন, ঋণ সহায়তা ও অন্যান্য সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে দরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, ঝুঁকিপূর্ণ বা অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন।

বন্দীদের মুক্তি ও সেনা হিসেবে ব্যবহার

রাশিয়া খুন ও ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত বন্দীদেরও যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাচ্ছে। মুক্তির প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তাদের সামনের সারিতে পাঠানো হয়। এতে কারাগারের জনসংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩১৩,০০০-এ নেমেছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

দেশপ্রেম ও জনসমর্থন

সব সৈন্যই অর্থ বা মুক্তির জন্য যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন না। লেভাদা সেন্টারের জরিপে দেখা গেছে, রাশিয়ার প্রায় ৭৫ শতাংশ জনগণ যুদ্ধকে সমর্থন করছে। চেনিনের মতে, অনেকেই দেশপ্রেম ও মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার টানে সেনাবাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন।

অর্থনৈতিক প্রণোদনা, সামাজিক চাপ, বন্দীদের ব্যবহার এবং দেশপ্রেম—সবকিছুর সমন্বয়ে রাশিয়া বিপুল জনবল ক্ষতির মধ্যেও তার সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠন করে যাচ্ছে।

সূত্র : আল জাজিরা

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top