সৈয়দ শামসুল হুদা
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার কয়েকটি কারণ ছিল। তারমধ্যে অন্যতম ছিল যে কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ বিরোধিতা, ব্যক্তিগত অসাধারণ সততা ও তুলনাহীন দেশপ্রেম। একজন সাধারণ মেজর হয়েও তিনি অসাধারণ হিসেবে জাতির সামনে উঠে এসেছিলেন বলেই খুব অল্প সময়ের প্রেসিডেন্সির সময় তিনি তৃণমূলে একটি গভীর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। এদেশের মানুষ ১৯৪৭ সালেই প্রমাণ করেছে যে, তারা ভারতের আধিপত্য মেনে নিবে না। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, বর্তমান বিএনপির যে সকল নেতৃবৃন্দকে মানুষ সবসময় মিডিয়ায় দেখে, আর যাদের কথা খুব বেশি প্রচারিত হয়, তারা জিয়ার এই সব আদর্শের ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন।
বিএনপির অতীতের সফলতার পেছনে দুটো কারণ ছিল। এক এন্টি ইন্ডিয়ান দল এবং এন্টি আওয়ামী লীগ। লীগ বিদায়ের পর বিএনপির কিছু পরিচিতমুখ বিএনপিকে এই দুটি জায়গায় আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিছে। বিএনপি ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী ছিল। সেই জায়গা থেকে বিএনপি দূরে সরে এসেছে। এরফল কী হতে পারে তা তাদের ধারণাতেই ছিল না। কিন্তু ডাকসু নির্বাচন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, ভারত বিরোধিতা থেকে সরে এলে, ইসলামী মূল্যবোধকে ধারণ থেকে সরে এলে, লীগ তোষণের নীতিও কৌশল ধারণ করলে বিএনপি শুধু পরাজিতই হবে না, বিলুপ্তও হয়ে যেতে পারে।
একটি কথা বলি, বিগত ১৫-১৬ বছর যে দলটি লীগের অন্দরমহলে ঢুকে শুধু নিজেদের অস্তিত্বই রক্ষা করেনি, বরং লীগকেই একেবারে খেয়ে দিয়েছে। আজ প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের এই মহা উত্থান হঠাৎ করেই হয়নি, বরং তাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, ত্যাগ ও কৌশলের ফসল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয়টি ৫ আগষ্ট অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে প্রকাশ পেলেও প্রশাসন এবং দলীয় রাজনীতিতে জামায়াতের অনুপ্রবেশের কৌশলগত উত্থানের বিষয়টি এখনো দৃশ্যমান হয়নি। সেটা যখন প্রকাশ পাবে, তখন দেখা যাবে যে, দেশে লীগ এবং জামায়াত ছাড়া অন্য কারো কোনো অস্তিত্বই নেই।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে জামায়াতের হাজারো শুভাকাঙ্খী আছে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীতে বিএনপির শুভাকাঙ্খী একজনও নেই। বিএনপিতে হাজারো দায়িত্বশীল পাওয়া যাবে যারা মূলতঃ জামায়াত করে। নানান কৌশলগত কারণে তারা নিজেদেরকে বিএনপি বলে পরিচয় দেয়। প্রশাসনে জামায়াতের এমন অসংখ্য দায়িত্বশীল আছে যারা মূলতঃ জামায়াত। কিন্তু পরিচয় দেয় বিএনপি। এর ফলস্বরূপ ধারণা করা যাচ্ছে যে, ঢাবি থেকে যেভাবে ছাত্রদল নাই হয়ে গেছে, ঠিক তদ্রুপ সময় ও পরিবেশ আসলে প্রশাসন থেকে বিএনপি মাইনাস হয়ে যাবে। তাদের দল নড়বড়ে হয়ে পড়বে।
আপনি যদি এখনই লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখবেন যে, মাঠে ময়দানে বিএনপির পক্ষে কথা বলার লোক এখনই একেবারে কমে আসছে। কিছু নেতাকর্মী যারা হুমতাম করে ক্ষমতা দেখাচ্ছে, নিজেদের বিএনপির কর্মী বলে পরিচয় দিচ্ছে, তাদেরকে আসলে মানুষ খারাপ দৃষ্টিতেই দেখে। আপনার আশে-পাশে, দোকানে, ব্যবসায়িক সেন্টারে দেখবেন, জামায়াতের ব্যাপক উত্থান ঘটেছে।কিন্তু ক’জন পাবেন যারা নিজেদের এখনো বিএনপি পরিচয় দেয়। কিছূ অপরিণামদর্শী বিএনপির বালখিল্য আচরণের কারণে গোটা বিএনপি এখন আসামীর কাঠগড়ায়। এমন একটি অবস্থায় যারা নিজেদের দুর্বল সুরে বিএনপি পরিচয় দিতো, তারাও কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছে। বিএনপিতে নব্য বিএনপির উত্থান ঘটে গেছে। এরা ফ্যাসীবাদি আমলের সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। আর ত্যাগী নেতারা লজ্জায় মুখ খুলতে পারছে না। তাদেরকে মিডিয়ার পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডার কাছে হেরে যেতে হচ্ছে।
তাহলে ফলাফল দাঁড়াচ্ছে যে, বিএনপির কিছু প্রভাবশালী সদস্য যারা মূলতঃ বিএনপি করে না, তাদের কেউ আওয়ামী অনুকম্পাধারী। তাদের অনেকে জামায়াতের সাথে রাতের আঁধারে গভীর সম্পর্ক রাখে। মূলতঃ বিএনপি এমন নেতার সংখ্যা খুব কম। বর্তমান রাজনীতি, প্রোপাগান্ডা, শীতকালের ওয়াজ মাহফিলে ঠিক মতো বিএনপি ধোলাই চলমান থাকলে আগামি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেই বিএনপি নাই হয়ে যেতে পারে। বিএনপির ভেতরে লুকিয়ে নিজেদের আড়াল করে রাখা লোকগুলো যখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করবে, তারা যখন নিজেদের আসল পরিচয়ে প্রকাশ হয়ে পড়াকে অনিরাপদ মনে করবে না, তখন বিএনপির কতজন লোক দলে থাকে সেটা ভাববার বিষয় হয়ে উঠবে। বিএনপি কি এসব বিষয় নিয়ে কিছু ভাবছে? ডাকসু কি তাদেরকে দলীয় শৃঙ্খলা, ভবিষ্যত করণীয় নির্ধারণে উৎসাহ যোগাবে?
লেখক : আলেম ও বুদ্ধিজীবী




