“বৃহত্তর ইসরাইল” জায়নবাদী আন্দোলনের একটি মৌলিক আকাঙ্ক্ষা, যার শিকড় বাইবেলীয় এস্কেটেলজি তথা শেষ জমানার ধর্মতত্ত্বে প্রোথিত। নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত বিস্তৃত এই কাল্পনিক সীমারেখা দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলি রাজনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি পর্যবেক্ষকরা একে একটি সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখেন। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই তত্ত্বকে নিয়মিতভাবে তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, যা ২০২৫ সালে সিরিয়ায় ইসরাইলের পদক্ষেপগুলো থেকে আরো স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
.
সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে ইসরাইলের কৌশলগত পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা শুধু সামরিক দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কুনেইত্রা প্রদেশে তাদের একাধিক সামরিক অভিযান, আবাসিক এলাকায় হামলা এবং কৌশলগত স্থানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ইসরাইলি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। দারা এবং সুয়েইদা প্রদেশে ১০টি নতুন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের মাধ্যমে তারা যে ভূ-কৌশলগত অবস্থান তৈরি করেছে, তা ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে। ইসরাইলের মূল লক্ষ্য, দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা এতে নতুন করে বাস্তুচ্যুত হবেন।
.
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নেতানিয়াহু দক্ষিণ সিরিয়ার কুনেইত্রা, দারা এবং সুয়েইদা প্রদেশে সম্পূর্ণ অস্ত্রমুক্তকরণের দাবি জানিয়ে বলেছিল- “We demand the complete demilitarization of southern Syria in the Quneitra, Daraa and Suwayda provinces from the forces of the new regime”. কার্যত এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো তার এই ঘোষণা- ‘ইসরাইলি সেনাবাহিনী এই অঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করবে’, আন্তর্জাতিক আইনের পরিভাষায় স্পষ্ট দখলদারি (occupation)। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপকে একটি বাফার জোন তৈরির কৌশল হিসেবে দেখছেন, যা ভবিষ্যতে যেকোনো প্রতিরোধ আন্দোলনকে প্রতিহত করতে সাহায্য করবে।
.
আঞ্চলিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের ভূমিকা এক্ষেত্রে অত্যন্ত জটিল এবং বিতর্কিত। হায়াত তাহরির আল-শাম (HTS) এর দিমাশক অগ্রাভিযানের সময় তার নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা না করার সিদ্ধান্তটি ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্ষমতার ভারসাম্য তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তুরস্কের এই নিষ্ক্রিয়তা পুরো অঞ্চলের শক্তির কাঠামোতে একটি শূন্যতা তৈরি করেছে, যা ইসরাইল দ্রুততার সঙ্গে পূরণ করেছে।
.
২০২৪-২০২৫ সালের HTS অভিযানে তুরস্কের প্রত্যক্ষ সমর্থনের পেছনে ছিল একাধিক ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। এরদোয়ানের কুর্দি ইস্যু, আসাদ সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং সিরিয়ান শরণার্থী সমস্যার সমাধানের আকাঙ্ক্ষা তার নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ম অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদী লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বার্থ বিসর্জন দেয়া একটি কূটনৈতিক ভুল। তাত্ত্বিকভাবে এরদোয়ানের এই নীতির উদ্দেশ্য ছিল কুর্দি শক্তিকে দুর্বল করা, কিন্তু বাস্তবে এটি সিরিয়াকে ইসরাইলের কাছে একটি ‘লো হ্যাঙ্গিং ফ্রুট’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
.
আঞ্চলিক ব্যর্থতার এই চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা অন্যান্য আরব নেতাদের ভূমিকা দেখি। মিশরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসির নীরবতা, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ড-পরবর্তী তৎপরতা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বাভাবিকীকরণ নীতি এবং জর্দানি রাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক নিষ্ক্রিয়তা- সবকিছুই আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটি নিওরিয়ালিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র নিজস্ব স্বার্থের বাইরে কিছু ভাবে না।
.
HTS-এর নেতা আহমদ আল-শারা (জুলানি) এর অবস্থানটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি জটিল পরিস্থিতির উদাহরণ। আল-কায়েদা থেকে আলাদা হয়ে একজন প্রাগম্যাটিক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার তার প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জনের একটি কৌশল। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, একটি নতুন সরকারের প্রাথমিক দিনগুলোতে বাহ্যিক চাপ মোকাবেলার সক্ষমতা সীমিত থাকে। ইসরাইলের ক্রমাগত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে তার নীরবতা হয় অক্ষমতার প্রমাণ, নয়তো একটি নীরব সমঝোতার ইঙ্গিত। আমেরিকার হুররাস নেতাদের নিশ্চিহ্ন করার ঘটনা এক্ষেত্রে একটি বার্তা পাঠানোর কৌশল হতে পারে যে, নতুন সরকার পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করবে।
.
সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ দেশটির অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অনুমান অনুযায়ী, সিরিয়ার জিডিপি ২০১০ সালের তুলনায় ৬০% হ্রাস পেয়েছে। এই অর্থনৈতিক দুর্বলতা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং একইসঙ্গে বাহ্যিক শক্তিগুলোর জন্য প্রভাব বিস্তারের সুযোগ।
পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ অনুমান করা হচ্ছে ৩০০-৪০০ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অঙ্কের অর্থায়নের জন্য সিরিয়াকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ইসরাইলের মতো অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
.
সিরিয়ার বর্তমান সংকট একটি বহুমুখী ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি, রাশিয়ার ভূমিকা হ্রাস, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমে যাওয়া- এই সবকিছুই সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলছে। ইসরাইলের বর্তমান পদক্ষেপগুলো এই ক্ষমতার শূন্যতাকে কাজে লাগানোর একটি পরিকল্পিত কৌশল।
.
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বৈশ্বিক শক্তির বর্তমান কাঠামোতে, যেখানে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে নতুন ঠান্ডা যুদ্ধের আবহ বিরাজমান, সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেয়া চ্যালেঞ্জিং। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরাইলের বর্তমান পদক্ষেপগুলো একাধিক আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেনশনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ, যা রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিষয়ে বলে, সরাসরি লঙ্ঘিত হচ্ছে। জেনেভা কনভেনশনের চতুর্থ অধ্যায়, যা দখলদার শক্তির দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করে, সেই প্রেক্ষিতেও ইসরাইলের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ।
.
কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক সমস্যা, এর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীলতা। নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের সীমিত ক্ষমতা এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য- এই সবকিছুই আইনি সমাধানের পথে বাধা।
.
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, সিরিয়ার সংকটের সমাধান নির্ভর করছে একাধিক ফ্যাক্টরের ওপর। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, জনগণের প্রতিরোধ ও আন্দোলনের শক্তি। নিজস্ব ক্ষমতা না থাকলে সবকিছুই কাগুজে বাণী।
.
সিরিয়ায় ইসরাইলি আগ্রাসন মোকাবেলায় যে বহুমাত্রিক তৎপরতা প্রয়োজন এ মুহূর্তে তা উপলব্ধ নয়। অর্থাৎ, আঞ্চলিক সংহতি ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ। যা কেবল আবেগতাড়িত সংহতি নয়, বরং কংক্রিট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতে এর আশা করা যায় না।
.
আধুনিক যুগের ভূ-রাজনীতিতে তথ্য যুদ্ধ (information warfare) এবং জনমত গঠনের ভূমিকা অপরিসীম। সিরিয়ার সংকটের ন্যারেটিভ কনট্রোল করা এই সংঘর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোতে সিরিয়ার অবস্থানকে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে হবে।
.
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্সের যুগে, জনমত গঠন এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিতকরণের নতুন পদ্ধতি উদ্ভব হয়েছে। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় ইসরাইল অগ্রগামী অবস্থানে রয়েছে, যা তাদের কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে। সাইবার ক্ষমতা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং এআই-চালিত নজরদারি ব্যবস্থা তাদের সিরিয়ার মতো জটিল ভূখণ্ডে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করছে।
.
মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের বৈশ্বিক রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। উসমানি সাম্রাজ্যের পতনের পর সাইকস-পিকো চুক্তি, ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ, ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি, অসলো চুক্তি এবং সাম্প্রতিক অ্যাব্রাহাম অ্যাকর্ড- প্রতিটি ঘটনাই এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তন করেছে। সিরিয়ার বর্তমান সংকটও সেই ধারাবাহিকতারই একটি অধ্যায়, যার প্রভাব পরবর্তী দশকগুলোতে অনুভূত হবে।
.
সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি আঞ্চলিক বিরোধ নয়, এটি বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও। একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যে মাল্টিপোলার বিশ্বব্যবস্থার উত্থান ঘটছে, সেই প্রেক্ষিতে সিরিয়ার ঘটনাগুলো একটি মাইলফলক হতে পারে। পশ্চিমা আধিপত্যের যুগের অবসান এবং নতুন শক্তির উত্থানের এই ক্রান্তিকালে, সিরিয়া হয়ে উঠেছে একটি টেস্ট কেস।
.
চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব, আমেরিকার ‘পিভট টু এশিয়া’ নীতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য- এই সবকিছুই সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলছে। ইসরাইলের বর্তমান কৌশল এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের সুবিধা নেয়ার একটি চেষ্টা, যেখানে তারা আমেরিকান সমর্থনের পাশাপাশি অন্যান্য পরাশক্তিগুলোর নিষ্ক্রিয়তাকে কাজে লাগাচ্ছে।
.
অন্যদিকে ভূ-অর্থনৈতিক দিক থেকে সিরিয়ার কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের গ্যাস ও তেল পরিবহনের রুট, ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্য পথ এবং এশিয়া-ইউরোপ-আফ্রিকার সংযোগস্থল হিসেবে সিরিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান অতুলনীয়। ইসরাইল বা পশ্চিমা বিশ্ব নিশ্চিতভাবে এসব কৌশলগত সুবিধার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় স্টেপ নেবে।
.
বিশেষত, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে আবিষ্কৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল মজুদ এই অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। লেভানটাইন বেসিনে অনুমিত ৩.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ এবং ১.৭ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের সম্ভাবনা এই অঞ্চলকে একটি নতুন এনার্জি হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ এই সম্পদের ভাগাভাগিতে ইসরাইলকে একটি শক্তিশালী অবস্থান দেবে।
.
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান মরুকরণ, পানির সংকট এবং কৃষিজমির অবক্ষয় লাখো মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। এই পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে তুলছে এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর জন্য নতুন হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করছে। ইসরাইলের জল ও কৃষি প্রযুক্তিতে অগ্রগতি এই ক্ষেত্রে তাদেরকে কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে।
.
সিরিয়ার বর্তমান সংকট একটি জটিল সভ্যতাগত সংঘর্ষের চিত্র তুলে ধরে। স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ তত্ত্বের আলোকে একে ইহূদি-খৃস্টান সভ্যতা বনাম ইসলামি সভ্যতার একটি সংঘাত হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু এই সরলীকৃত দৃষ্টিভঙ্গি সিরিয়ার বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় সমাজের জটিলতাকে উপেক্ষা করে। সিরিয়ার সমাজে আরব মুসলমান, কুর্দি, দ্রুজ, খৃস্টান, আলাওয়াইত, ইয়াজিদি এবং আরও অনেক জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু রয়েছে। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা সিরিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরাইলের কৌশল এই বৈচিত্র্যকে দুর্বলতা হিসেবে ব্যবহার করে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি প্রয়োগ করা। দ্রুজ বিচ্ছিন্নতাদী হিকমত আল-হিজরির সুয়েইদা প্রদেশে বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা এবং “National Guard” গঠনের সিদ্ধান্ত ইসরাইলি সন্ত্রাসীদের সুস্পষ্ট উস্কানির ফল।
.
সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের একটি বড় পরীক্ষা। বিশেষত, ‘প্রোটেক্ট টু রেস্পনসিবিলিটি’ (R2P) নীতির প্রয়োগ এই ক্ষেত্রে একটি জটিল বিষয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব রয়েছে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে হস্তক্ষেপ করা। কিন্তু এই হস্তক্ষেপ মুসলিম দেশগুলোতে প্রায়শ নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়।
.
শরণার্থী সংকটের দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের মতে, সিরিয়ান শরণার্থীর সংখ্যা ৬.৮ মিলিয়ন এবং অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ৬.৯ মিলিয়ন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং পুনর্বাসন সিরিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্তু ইসরাইলের সম্প্রসারণ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।
.
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে জাতিসংঘ এবং তার বিভিন্ন সংস্থা এধরনের সংকট মোকাবেলায় প্রধান ভূমিকা পালন করত। কিন্তু বর্তমানে আঞ্চলিক সংস্থা এবং বহুপক্ষীয় জোটগুলো অধিক সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। আরব লিগ, ইসলামি কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (OIC), এবং এমনকি BRICS-এর মতো নতুন প্ল্যাটফর্মগুলোরও এই বিষয়ে কিছুটা নড়াছড়া লক্ষণীয়।
.
সিরিয়ার বর্তমান সংকট শুধু একটি আঞ্চলিক বিরোধ নয়, এটি একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই সংকটের সমাধান হবে ভবিষ্যতে অনুরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য একটি নজির। আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা, মাল্টি পোলারিটির ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা এবং সর্বোপরি মানবিক মূল্যবোধের প্রাধান্য- এই সবকিছুই নির্ভর করছে সিরিয়ার এই সংকটের সমাধানের ওপর।
.
ধর্মীয় পণ্ডিতেরা বর্তমান ঘটনা প্রবাহকে শেষ জমানার আলামত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। ইসলামি এস্কেটেলজিতে “আল-মালহামাতুল কুবরা” (মহাযুদ্ধ)-এর যে বর্ণনা রয়েছে, তার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বিশেষত শাম অঞ্চলে (সিরিয়া-ফিলিস্তিন) চূড়ান্ত যুদ্ধের যে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, সেই প্রেক্ষিতে বর্তমান ঘটনাগুলো বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ইসলামি ঐতিহ্যে আহলে কিতাবদের (ইহূদি ও খৃস্টান) সঙ্গে চূড়ান্ত সংঘর্ষ এবং দাজ্জালের আবির্ভাবের যে বিবরণ রয়েছে, অনেকে বর্তমান পরিস্থিতিকে সেই প্রেক্ষিতে দেখছেন।
.
খৃস্টান এস্কেটেলজিতেও “আর্মাগেডনের” যুদ্ধে ইসরাইলের ভূমিকা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। প্রোটেস্ট্যান্ট খৃস্টান জায়নবাদী গোষ্ঠীগুলো ইসরাইলের বর্তমান সম্প্রসারণকে বাইবেলীয় ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা হিসেবে দেখেন। এই ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর, কারণ এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে। বিশেষত রিপাবলিকান পার্টির নীতিনির্ধারণে এস্কেটেলজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
.
ইহূদি ধর্মেও এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। অর্থোডক্স ইহূদি সম্প্রদায়ের একটি অংশ রাজনৈতিক জায়নবাদের বিরোধী এবং তারা মনে করেন, ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা মেসিয়ার আগমনের পূর্বে ঘটেছে বলে এটি ঐশ্বরিক পরিকল্পনার বিরুদ্ধ। অন্যদিকে, ধর্মীয় জায়নবাদীরা ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রতিষ্ঠাকে ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হিসেবে দেখে।
.
ইতিহাসে আমরা দেখি, কোনো অন্যায়-ই চিরস্থায়ী হয়নি। আল্লাহর ইচ্ছায় সিরিয়ার জনগণ এই সংকট মোকাবেলা সক্ষম হবেন এবং এ অঞ্চলে দ্রত একটি গুরুত্বপূর্ণ পটপরিবর্তন ঘটবে। ইসরাইল অবশ্যই তার গ্রেটার ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় ব্যর্থ হবে। তাদেরকে খুব দ্রুতই পৌনে এক শতাব্দীর পাপের প্রায়শ্চিত করতে হবে। সময় আসছে। শুধু নেতৃবৃন্দকে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।




