বৃহত্তর ইসরাইল, তাওরাত, নেতানিয়াহু, জায়নিস্ট আন্দোলন, ফিলিস্তিন,

বৃহত্তর ইসরাইল : তাওরাতের ভবিষ্যদ্বাণী থেকে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বিবৃতিতে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রকল্প সম্পর্কে নতুন ইঙ্গিত পাওয়ার পর আঞ্চলিক সম্প্রসারণ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এতে ইসরাইলের সীমানা পুনর্বিবেচনা, ফিলিস্তিনে অতিরিক্ত এলাকা অন্তর্ভুক্তকরণ, নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং আরো আরব ভূমি দখলের আহ্বান রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদরা এই বক্তব্যকে শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য বড় হুমকি বলে মনে করছেন।

তাওরাতে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ ধারণা

জেরুজালেম অধ্যয়নের বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল্লাহ মারুফ জানান, ‘বৃহত্তর ইসরাইল‘ ধারণাটি ইহুদি ধর্মের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে যুক্ত বাইবেলের একটি পাঠ্যাংশের উপর ভিত্তি করে, যা ‘প্রতিশ্রুত ভূমি‘ নামে পরিচিত। আদিপুস্তকের ১৫ অধ্যায়ের ১৮-২১ আয়াতে উল্লেখ রয়েছে যে ঈশ্বর আব্রাম (আব্রাহাম)-কে মিসরের নদী (নীল) থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত ভূমি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এই প্রতিশ্রুতি ইসমাইল নয়, ইসহাকের বংশধরদের দেয়া হয়েছিল।

এই ধারণাটি যুগে যুগে বিকশিত হয়ে জায়নিস্ট আন্দোলনের সময় পুনরায় সামনে আসে, বিশেষ করে ধর্মীয় জায়নিস্ট সাহিত্যে, যেখানে প্রতিশ্রুত ভূমি বাস্তবায়নকে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রবেশদ্বার হিসেবে ধরা হয়।

ইহুদিবাদ ও প্রকল্পের উৎপত্তি

‘বৃহত্তর ইসরাইল‘ শব্দটি ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর প্রচলিত হয়, যা ১৯৪৮ সালের সীমানার বাইরে একটি সম্প্রসারণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে। ইসরাইলি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মোমেন মুকদাদ বলেন, এটি মূলত একটি ধর্মীয় প্রকল্প, যা ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী ইহুদি আন্দোলনের দ্বারা সমর্থিত। বাইবেলের সংখ্যা ও যিহোশূয়ের বই অনুসারে লেভান্টের বৃহৎ অংশকে ‘প্রতিশ্রুত ভূমি‘ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অনেক আন্দোলনের মতে, এই সীমানার মধ্যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ধর্মীয় কর্তব্য।

সীমানা নিয়ে বিতর্ক

গবেষক জিয়াদ আবাইস বলেন, ‘বৃহত্তর ইসরাইল‘ এর সীমানা নিয়ে ইহুদি সমাজে এখনো ঐকমত্য নেই। নেতানিয়াহুর কাছে এটি নতুন নয়; তিনি শুধু বাস্তবায়নের উপযুক্ত সময় খুঁজে পেয়েছেন।

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মাত্রা

মুকদাদের মতে, প্রকল্পটি আঞ্চলিক আধিপত্যের রাজনৈতিক কৌশল এবং বাইবেলের ধর্মীয় বিশ্বাস—দু’টির সমন্বয়। যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ মানচিত্র গ্রহণের ঘোষণা দেয়নি, নেতানিয়াহুসহ কিছু ব্যক্তিত্বের বক্তব্যে দেখা যায় যে গাজা, লেবানন, পশ্চিম তীর, সিরিয়া ও ইরানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাড়িয়েছে।

জর্ডানের সাবেক তথ্যমন্ত্রী সাখের দুদিন বলেন, নেতানিয়াহু নিজেকে আধ্যাত্মিক মিশনের অংশ মনে করেন এবং আমেরিকান সমর্থন, পশ্চিমা নীরবতা ও আরব-ইসলামী সমর্থনের অভাবে এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি আরব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা, ইসরাইলের সাথে সহযোগিতা বন্ধ করা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান।

আঞ্চলিক প্রভাব ও উদ্বেগ

আল-কুদস সেন্টারের পরিচালক ওরাইব আল-রানতাউই জানান, নেতানিয়াহুর বক্তব্য শুধু জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন ও মিশর নয়, সমগ্র অঞ্চলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ‘বৃহত্তর ইসরাইল‘ প্রকল্প ছয়টি আরব দেশকে লক্ষ্য করে এবং পূর্ণ আমেরিকান সমর্থন ও আরব নিষ্ক্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল।

ইসরাইলি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইসমাইল মুসলিমানি বলেন, এই প্রকল্প ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনা ধ্বংস করবে, জর্ডান ও মিশরের নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক চাপ বাড়াবে, লেবানন ও সিরিয়ার সাথে সংঘর্ষের ঝুঁকি রাখবে এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির সাথে আব্রাহাম চুক্তির গতিপথ প্রভাবিত করবে।

সূত্র : আল জাজিরা মুবাশ্বির

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top