চীন বিশ্বের বৃহত্তম পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে, যার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ব্রিটেনের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ চাহিদাও পূরণ করতে পারবে। ১৭০ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পটি শক্তির দিক থেকে যদিও বর্তমানে বিদ্যমান থ্রিগর্জেস বাঁধের তুলনায় কম। তবে এর রাজনৈতিক, পরিবেশগত ও কৌশলগত তাৎপর্য অসামান্য। প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের উদ্বোধনের পর থেকেই চীনা নির্মাণ ও প্রকৌশল খাতে শেয়ারমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
চীনের দৃষ্টিভঙ্গি : উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তা
বেইজিং-এর জন্য এই প্রকল্পটি তিনটি বড় সুযোগ এনে দেয়- পরিষ্কার বিদ্যুৎ উৎপাদন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক মন্দা রোধে উদ্দীপনা। প্রকল্পটি তিব্বতের একটি অংশে নির্মিত হবে, যেখানে নদীটি ২০০০ মিটার উচ্চতা থেকে নিচে নামে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় পাঁচটি বাঁধ নির্মাণ করা হবে এবং ২০৩০ সালের শুরুর দিকে প্রথম বিদ্যুৎ উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও খরচের বাইরের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চীন এখনো প্রকাশ করেনি।
প্রতিবেশীদের উদ্বেগ : পানি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জটিলতা
এই গোপনীয়তাই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও বাংলাদেশে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ব্রহ্মপুত্র নদ, যা চীনের অংশে ইয়ারলুং জাংবো নামে পরিচিত, তিব্বতের মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারত ও বাংলাদেশে প্রবাহিত হয় এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকা, কৃষি ও পানীয় জলের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে।
ভারতের অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, এই বাঁধ প্রকল্প নদীর ৮০ শতাংশ প্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে। যার ফলে আসামসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। পলি প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে, যা নিম্নভূমির কৃষিক্ষেত্রে দরকারি পুষ্টি বহন করে থাকে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল স্টেকলার এই প্রকল্পকে পানি ও পলির প্রাকৃতিক প্রবাহে বাধা বলে মনে করছেন। একইসাথে, অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সায়ানাংশু মোদক উল্লেখ করেছেন, সীমান্ত সঙ্ঘাতের ইতিহাস এবং চীনের স্বচ্ছতার অভাব ভারতীয়দের মনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে- চীন কি কৌশলগতভাবে পানি বন্ধ করে দিতে পারে?
চীনের প্রতিক্রিয়া
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, ‘ইয়ারলুং জাংবো পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ চীনের সার্বভৌম বিষয়।’ তাদের দাবি, এই প্রকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে এবং পরিষ্কার শক্তি সরবরাহ করবে। একইসাথে তারা বলেছে, ভাটির দেশগুলোর সাথে পানিবিদ্যুৎ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও দুর্যোগ প্রশমনসংক্রান্ত কিছু পর্যায়ে যোগাযোগ করা হয়েছে।
ভারতীয় প্রতিক্রিয়া ও পানির উৎস বিশ্লেষণ
ভারতের পররাষ্ট্র ও পানি মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে গবেষক মোদকের মতে, ব্রহ্মপুত্র নদে প্রবেশকারী পানির প্রধান উৎস চীনের অংশ নয়। বরং হিমালয়ের দক্ষিণের মৌসুমি বৃষ্টিপাত। এছাড়া, চীনের প্রস্তাবিত বাঁধটি ‘রান-অফ-দ্য-রিভার’ প্রকল্প, যার মানে হলো পানি প্রবাহ রুদ্ধ না করে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
উল্লেখ্য, ভারত নিজেও একই নদীর উপরে দু’টি পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছে, যার মধ্যে একটি প্রকল্প ১১.৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এবং এটি ভারতের সর্ববৃহৎ পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প হতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
মোদকের মতে, এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে ভারতও নিজের অবস্থান মজবুত করতে চায়। যদি ভারত প্রমাণ করতে পারে যে তারা নদীর পানি ব্যবহার করছে, তাহলে চীনের একতরফা পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হবে।
বৈশ্বিক পানি বিরোধের প্রেক্ষাপট
বাঁধ এবং পানি নিয়ে বিরোধ বিশ্বজুড়েই বিদ্যমান। পাকিস্তান ভারতকে সিন্ধু পানি চুক্তির মাধ্যমে পানি সরবরাহকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ করেছে। আফ্রিকায় মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে নীল নদের পানি ব্যবহার নিয়েও দীর্ঘমেয়াদী উত্তেজনা চলছে।
প্রকল্পের নিরাপত্তা ঝুঁকি
চীনের এই নতুন বাঁধ প্রকল্প একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে নির্মিত হচ্ছে, যেখানে ভূমিধস, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের বন্যা এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। উচ্চ উচ্চতা এবং কঠিন আবহাওয়াজনিত কারণে প্রকল্পের প্রকৌশলিক বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
চীনের এই বিশাল প্রকল্প তাদের জন্য একটি উন্নয়ন ও শক্তির উৎস হলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য এটি উদ্বেগ, কৌশলগত জটিলতা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ কিভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং চীন কতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখে, তার ওপর নির্ভর করবে আঞ্চলিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা।
সূত্র : রয়টার্স




