সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার সোয়াইদা অঞ্চলে বেদুইন এবং দ্রুজ উপজাতিদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং তাতে ইসরাইলি হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের এক নতুন সাম্প্রদায়িক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে। মিশরীয় এক সাংবাদিকের সঙ্গে এক কথোপকথনে এই ঘটনা নতুন প্রজন্মের পরিচয়চর্চা এবং সম্ভাব্য রাষ্ট্র কাঠামোর পুনর্বিন্যাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
এই ধরনের ভাঙন ও সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নয়। অতীতে লেবাননের গৃহযুদ্ধ, আলজেরিয়ার ‘কৃষ্ণ দশক’ এবং আরব বসন্ত-পরবর্তী সংকটপূর্ণ সময়ে আরব বিশ্বে পরিচয়কেন্দ্রিক সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করেছিল। সোয়াইদার সাম্প্রতিক ঘটনা সেই ধারাবাহিকতারই সম্ভাব্য নতুন অধ্যায় হতে পারে, যা সিরিয়ার আঞ্চলিক ও মানবিক ঐক্যের ওপর হুমকি তৈরি করছে এবং দেশের পুনর্গঠনকে কেন্দ্রহীন বা ফেডারেল কাঠামোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তবে এই সংকট শুধু সিরিয়ার অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ নয়। এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি মাগরেব পর্যন্ত। এই সংঘর্ষগুলি শুধু সাময়িক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার মহড়া – একটি নতুন সাইকস-পিকট, যা প্রাচীন ঔপনিবেশিক সীমারেখা ভেঙে আবারও খণ্ডায়নের পথে নিয়ে যেতে পারে।
আরবি ভাষার সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষণধর্মী চ্যানেলসমূহ সোয়াইদার ঘটনার গুরুত্বকে গভীরভাবে চিহ্নিত করেছে। এটি শুধুমাত্র সিরিয়ার শাসনব্যবস্থার জন্য হুমকি নয়, বরং ধর্মীয় ও জাতিগত সীমারেখার উপর ভিত্তি করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পুনর্গঠনের ইঙ্গিত বহন করে। বহু বিশ্লেষণ ইসরাইলি চিন্তাধারা ও গবেষণা কেন্দ্রসমূহের উপাত্তের উপর ভিত্তি করে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, ইসরাইল বহুদিন ধরেই প্রতিবেশীদের সাম্প্রদায়িক কাঠামো বিশ্লেষণ করে তার কৌশলগত নীতি নির্ধারণ করছে।
ইসরাইলের ‘বেন-গুরিয়ন মতবাদ’ অনুযায়ী, আরব দেশসমূহকে ঘিরে ফেলতে প্রথমে ইরান, কামালবাদী তুরস্ক এবং ইথিওপিয়ার মতো অআরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। পরবর্তীতে লক্ষ্য স্থানান্তরিত হয়েছে আরব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোর দিকে। লেবাননের ম্যারোনাইট খ্রিস্টানদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সহযোগিতা, সেই কৌশলের অংশ। এখন সেই কৌশল পুরো আরব বিশ্বের সাম্প্রদায়িক কাঠামো বিশ্লেষণ ও ব্যবহারে বিস্তৃত হয়েছে।
আজ ইসরাইলি নীতি গবেষণা কল্পনার পর্যায়ে সীমিত নেই। সিরিয়ার উপর তার হস্তক্ষেপ – সোয়াইদা, গোলান হাইটস, দামেস্কের গ্রামীণ অঞ্চলে বোমা হামলা, লেবানন ও জর্ডানের উপর চাপ – একটি সক্রিয় রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ডানপন্থী ইসরাইলি চিন্তকদের ভাষায় যেটি “বিকল্প স্বদেশ” হিসেবে পরিচিত।
নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ধারণা শুধু ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রহীন ফিলিস্তিন তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সাম্প্রদায়িক সংহতির ভিত্তিতে নতুন এক মধ্যপ্রাচ্য নির্মাণের প্রচেষ্টা। এই প্রক্রিয়ায় আমেরিকার ভূমিকাও কম নয়।
২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র শিয়া, সুন্নি ও কুর্দি পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করে। যদিও শিয়া, সুন্নি বা কুর্দি পরিচয় দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তবতা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঘনীভূত করে একটি রাজনৈতিক কাঠামোতে রূপান্তর করে। ২০০৫ সালের ইরাকি সংবিধানে সাম্প্রদায়িক ক্ষমতা বণ্টনের কাঠামো বৈধতা পায় এবং ‘কোটা’ পদ্ধতি চালু হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একটি গণতান্ত্রিক মডেল তৈরি করতে চাইলেও বাস্তবে সেটি সাম্প্রদায়িকীকরণের এক নতুন মঞ্চে রূপান্তরিত হয়।
দ্বিতীয় সাম্প্রদায়িক মোড় আসে ‘আরব বসন্ত’-পরবর্তী সময়ে। গণতান্ত্রিক দাবি ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক বিভক্তিতে রূপ নেয়। লিবিয়া, ইয়েমেন ও সুদানে এর ভয়াবহতা আজও বর্তমান।
মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, অবসন্ন পরিষেবা, দুর্নীতি, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা এবং দুর্বল নাগরিক সংস্কৃতি এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে সাম্প্রদায়িক মহামারী সহজেই বিস্তার লাভ করে।
পরিচয় ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়াশীল নীতি, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিপরীতে, ইসরাইল দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষাবিদ্যাভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই পরিস্থিতিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে।
সাম্প্রদায়িক পার্থক্য কোনো সমাজেই অস্বাভাবিক নয়। এগুলো সহাবস্থান করতে পারে একটি নাগরিক রাষ্ট্রের ছায়াতলে, যেখানে জাতি, ধর্ম, ভাষা বা সম্প্রদায়ভিত্তিক বৈষম্য নেই। ফরাসি প্রাচ্যবিদ ম্যাক্সিম রডিনসনের ভাষায়, যখন এই পরিচয় গোষ্ঠীগুলিকে অস্ত্রধারী মিলিশিয়া এবং বিদেশী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সক্রিয় করা হয়, তখন সেটি রূপ নেয় এক “সাম্প্রদায়িক প্লেগ”-এ, যা গোটা সমাজের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে।
এই সাম্প্রদায়িক প্লেগ প্রতিরোধের একমাত্র পথ হল পরিচয় ব্যবস্থাপনার যথাযথ কাঠামো গড়ে তোলা। সংখ্যালঘুদের অধিকার, সাংবিধানিক অংশগ্রহণ, প্রতীকের সুষ্ঠু বণ্টন এবং আঞ্চলিক বিশেষত্বের স্বীকৃতি – এসবই একটি স্থিতিশীল ও সহনশীল রাষ্ট্র নির্মাণে অপরিহার্য।
শেষ পর্যন্ত, নাগরিক রাষ্ট্রের ধারণা – যেখানে নাগরিকত্বই প্রধান পরিচয় – না থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সাম্প্রদায়িক মহামারী ও মিলিশিয়ার সশস্ত্র হুমকির সামনে প্রতিরোধহীন হয়ে পড়বে। পরিচয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা আর সাম্প্রদায়িক প্লেগের বিস্তার একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সূত্র : আল জাজিরা




