মাখমুর শরণার্থী ক্যাম্প, কুর্দি, পিকেকে

মাখমুর শরণার্থী ক্যাম্প : তুরস্কে ফেরার আশায় ১০ হাজার কুর্দি শরণার্থী

উত্তর ইরাকের নিনেভেহ গভর্নরেটের মাখমুর জেলায় অবস্থিত মাখমুর ক্যাম্পে প্রায় ১০ হাজার কুর্দি শরণার্থী তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন। তুরস্ক থেকে আসা এসব শরণার্থী কঠিন পরিস্থিতি ও ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক-নিরাপত্তা চাপে দিন কাটালেও তাদের দৈনন্দিন জীবন শান্তি ও নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আশায় আবদ্ধ।

কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) ও তুর্কি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের কারণে তুরস্ক থেকে পালিয়ে আসা রাজনৈতিক শরণার্থীদের জন্য ১৯৯৮ সালে এই ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়। আঙ্কারা অভিযোগ করে, ক্যাম্পের বাসিন্দারা দলের ক্যাডার ও সদস্য।

নিরাপত্তা বেষ্টনী

২০২১ সাল থেকে ক্যাম্পটি ইরাকি সরকারের আরোপিত নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় রয়েছে। এর আওতায় ক্যাম্পের বাইরে চলাচলে বিধিনিষেধ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অনুমতি ছাড়া অন্য গভর্নরেটে যাওয়া নিষিদ্ধ।

পিকেকের ঘনিষ্ঠ পিপলস অ্যাসেম্বলির সহ-সভাপতি ফিলিস বুদাক বলেন, পৌরসভা ও স্বাস্থ্যসেবা অবহেলিত, এবং বাসিন্দারা বছরের পর বছর বাগদাদ ও কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের অবরোধের মধ্যে রয়েছেন। বাগদাদ ও ইরাকি সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক হলেও বাস্তব কোনো ফল মেলেনি।

অন্যদিকে, ইরাকি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ফাদেল আবু রাগিফ দাবি করেন, এটি অবরোধ নয় বরং বাসিন্দাদের সুরক্ষার জন্য নিরাপত্তা বেষ্টনী। তার মতে, খাদ্য সরবরাহ সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে এবং তুরস্কে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া হলে তা কূটনৈতিক চ্যানেল ও জাতিসংঘের সমন্বয়ে হতে হবে।

কুর্দি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কামরান বারওয়ারি মনে করেন, বাগদাদ ও কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের ওপর তুরস্কের চাপের ফলেই এই নিরাপত্তা বেষ্টনী আরোপিত হয়েছে, যাতে পূর্ববর্তী চুক্তি বাস্তবায়ন করে ক্যাম্প খালি করা যায়। তবে তিনি বলেন, জোরপূর্বক স্থানান্তর অন্যায় হবে, আর তুরস্কে সাধারণ ক্ষমা বা সাংবিধানিক সংশোধন ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

প্রত্যাবর্তনের আশা

পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসের (এইচপিজি) প্রধান মুরাত কারাইলান সতর্ক করেছেন, বাসিন্দাদের ওপর চাপ অব্যাহত থাকলে যোদ্ধারা ক্যাম্পে যাবে। তবে আবু রাগিফ মনে করেন, ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে এই হুমকি কার্যকর করা কঠিন।

চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাসিন্দারা আশা করছেন, তুর্কি ও পিকেকের মধ্যে শান্তি প্রক্রিয়া অগ্রসর হলে তারা বাড়ি ফিরতে পারবেন। বাসিন্দা হোজান জোদি বলেন, শান্তি প্রক্রিয়া ও অভিযানের সমাপ্তির ঘোষণা তাদের আশা জাগিয়েছে, তবে প্রত্যাবর্তন নির্ভর করবে শান্তি চুক্তির সব শর্ত পূরণ ও দমন-পীড়ন না হওয়ার ওপর।

শরণার্থী বেফরিন জাগ্রোস জানান, প্রয়োজনে তারা আরও ১০ বছর সহ্য করতে প্রস্তুত, কিন্তু শান্তি প্রক্রিয়া অগ্রসর হলে এবং পিকেকে নিরস্ত্র হলে তারা তা মেনে নেবেন।

প্রতীকী গুরুত্ব

বছরের পর বছর মাখমুর ক্যাম্প পিকেকের সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত। দলের কারাবন্দী নেতা আবদুল্লাহ ওকালান শিবিরবাসীদের শান্তি প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে ভূমিকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি জানান, শিবিরের শরণার্থীরা ইউরোপীয় শরণার্থীদের সঙ্গে একযোগে ফিরে আসবেন।

ইরাকি সংসদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কমিটি বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চাপের সমন্বয়ে জটিল আকার নিয়েছে। নিরাপত্তা বেষ্টনী, তুর্কি চাপ, প্রত্যাবর্তনের আশা ও শান্তি প্রক্রিয়ার মধ্যে বাসিন্দারা শিক্ষা, কাজের সুযোগসহ নানাবিধ সেবার ঘাটতিতে ভুগছেন।

সূত্র : আল জাজিরা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top