ইসরাইল, গাজা, মার্কিন কর্পোরেট সংস্থা, গাজা

মার্কিন কর্পোরেটরা যেভাবে ইসরাইলের যুদ্ধে লাভের ফসল ঘরে তুলছে

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে মার্কিন কর্পোরেট সংস্থাগুলি গাজার মানবিক সংকটের মাঝেও নিজেদের মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইসরাইলের সামরিক কার্যক্রমকে ব্যবহার করছে। প্রবন্ধে বলা হয়েছে, জনসংখ্যার চরম দুর্ভোগ ও দুর্ভিক্ষ সত্ত্বেও, মার্কিন কোম্পানিগুলো ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে এবং একই সঙ্গে গাজায় চলমান মানবিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

দ্য নেশন ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয় পরিচালক ক্যাথারিনা ভ্যান ডেন হিউভেল তাঁর নিবন্ধে জোর দিয়ে লিখেছেন, ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে খাদ্য ও জরুরি সরবরাহ গাজায় প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, যেখানে কেবল একটি খাতেই প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করছে—তা হলো গণবিধ্বংসী অস্ত্রের সরবরাহ।

লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন আমেরিকান কোম্পানি এই যুদ্ধকে মুনাফার উৎসে পরিণত করেছে, যেখানে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের জন্য তাদের কোনও নৈতিক দায়িত্ববোধ নেই।

প্রবন্ধে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনের উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—এই অস্ত্রগুলোর প্রধান সরবরাহকারী হলো যুক্তরাষ্ট্র। “পেশা অর্থনীতি থেকে গণহত্যা অর্থনীতিতে” শিরোনামের প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, কীভাবে শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্পোরেশনগুলো বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ইসরাইলের নৃশংসতাকে সমর্থন করেছে। এটি একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গভীর মানবিক সংকটগুলোর একটি, যেখানে আমেরিকার অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা উঠে এসেছে।

ব্যতিক্রমী উদাহরণ

প্রবন্ধে আলবানিজের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, যুদ্ধের মাধ্যমে কর্পোরেট মুনাফা অর্জন নতুন কিছু নয়, তবে ফিলিস্তিনে যা ঘটছে তা সহিংসতার এক ব্যতিক্রমী শোষণচিত্র। উদাহরণস্বরূপ, লকহিড মার্টিন ইসরাইলকে যে যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেছে, তা প্রায় দুই লক্ষ ফিলিস্তিনিকে হত্যা বা আহত করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

ডেটা অ্যানালিটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক মার্কিন সংস্থা প্যালান্টির, ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সহযোগিতা করেছে এবং তাদের বোর্ড সভাও তেল আবিবে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যদিও গাজায় অভিযানের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটি অস্বীকার করেছে।

অন্যদিকে, ক্যাটারপিলার কোম্পানির সরঞ্জাম গাজায় ঘরবাড়ি ও হাসপাতাল ধ্বংসে ব্যবহৃত হয়েছে, যার ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়ে বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার যুদ্ধ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে তথাকথিত “ম্যাগনিফিসেন্ট ৭”—যুক্তরাষ্ট্রের সাতটি বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান: মাইক্রোসফ্ট, অ্যাপল, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট (গুগলের মূল কোম্পানি), মেটা (পূর্বে ফেসবুক), এনভিডিয়া এবং টেসলা। এই কোম্পানিগুলোর ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংযোগ রয়েছে।

গুগল ও অ্যামাজনের ক্ষেত্রে, প্রবন্ধে বলা হয়েছে—এই দুটি প্রতিষ্ঠান ইসরাইলি সামরিক বাহিনীকে ১.২ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ক্লাউড কম্পিউটিং সেবা দিয়েছে, যাকে এক ইসরাইলি কর্মকর্তা “বিষাক্ত গ্যাসের মতো একটি মারাত্মক অস্ত্র” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

কর্পোরেট মুনাফা বনাম মানবিক দুর্ভিক্ষ

লেখক উল্লেখ করেছেন, যখন লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি অবরোধ ও অনাহারে ভুগছে, তখন এসব কর্পোরেশনের লাভ নৈতিক দ্বিধার এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। মার্কিন সরকার ইসরাইলকে অস্ত্র রপ্তানি অব্যাহত রেখে এই পরিস্থিতির সহযোগী হয়ে উঠেছে এবং একই সঙ্গে দেশটির কোম্পানিগুলোর রাজস্ব আরও বাড়াচ্ছে।

যদিও আমেরিকান জনসাধারণের মধ্যে এসব অনৈতিক মুনাফার বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে, ওয়াশিংটনে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের প্রচেষ্টা এখনো রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার মুখে। তবুও লেখক মনে করেন, এই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বয়কট আন্দোলন এবং অভ্যন্তরীণ কর্মীপ্রতিরোধ—যেমন গুগল কর্মীদের প্রতিবাদ—এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে।

প্রবন্ধটি এক করুণ বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে শেষ হয়েছে—যেখানে খান ইউনিসের শিশুরা এখনও লবণাক্ত পানির জন্য অপেক্ষা করে, আর গাজার ডাক্তারা মেয়াদোত্তীর্ণ খাবারের ক্যান খুঁজে বেড়ান।

সূত্র : গার্ডিয়ান

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top