মালি,

মালির ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে কারা?

পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে এক ভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠছে। মালিতে জামাত নুসরাত উল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (JNIM) নামের সংগঠনটি শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছে। এই বাস্তবতা বুঝতে হলে আমাদের প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে মাঠপর্যায়ের সত্য অনুধাবন করতে হবে।
.
রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার শূন্যস্থান পূরণ
দশকের পর দশক ধরে মালির কেন্দ্রীয় সরকার উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের জনগণকে অবহেলা করেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, নিরাপত্তার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্বিচার নিপীড়ন সাধারণ মানুষকে সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। যেখানে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে JNIM নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়েছে।
.
এই সংগঠনটি কোনো বহিরাগত শক্তি নয়। তুয়ারেগ, আরব, ফুলানি, সংহাই এবং বাম্বারা—এসব জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এর সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় শিকড় থাকার কারণে তারা জনগণের সমস্যা বোঝে এবং বাস্তব সমাধান দিতে পারে। দস্যুতা দমন থেকে শুরু করে জমি-পানি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি পর্যন্ত—সব ক্ষেত্রেই তারা কার্যকর ভূমিকা রাখছে। মালির কিছু অঞ্চলে টানা ১১ বছর ধরে এই সংগঠনের শাসন চলছে, যা তাদের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।
.
সামাজিক ন্যায়বিচারের আহ্বান
JNIM-এর সাফল্যের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, তাদের সামাজিক ন্যায়বিচারের বাণী। তারা স্থানীয় অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে সোচ্চার, যারা বংশপরম্পরায় ক্ষমতা ও সম্পদ কুক্ষিগত রেখে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করেছে। কঠোর সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস যেখানে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে, সেখানে JNIM সবার জন্য সমান সুযোগের কথা বলে।
.
বিশেষ করে যারা ঐতিহাসিকভাবে দাসত্বের শিকার হয়েছে এবং প্রান্তিক পশুপালক সম্প্রদায়ের কাছে ইনসাফের এই বার্তা অত্যন্ত শক্তিশালী। মপ্তি অঞ্চলের এক যাযাবর পশুপালক ২০১৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের অভিজাতদের আধিপত্যের জোয়াল থেকে মুক্ত হতে চাই। প্রশাসনের যোগসাজশে তারা আমাদের শোষণ করেছে বছরের পর বছর। এজন্যই আমাদের অনেকে অস্ত্র হাতে নিয়েছে।’
.
JNIM-এর আন্দোলনকে পশ্চিমারা “উগ্রবাদ” বলে চিহ্নিত করতে চাইছে। কিন্তু এটি দীর্ঘ বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিক্রিয়া। ইসলাম যে সামাজিক সাম্যের কথা বলে, JNIM সেই আদর্শকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
.
বিবাহ সংকট ও সামাজিক সমাধান
মালির সমাজে আকাশছোঁয়া কনেমূল্যের কারণে অসংখ্য যুবক বিবাহ করতে অক্ষম ছিল। এই অর্থনৈতিক বাধা তাদের জীবনে হতাশা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। JNIM এই সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান দিয়েছে। তারা কনেমূল্য কমিয়ে যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে নিয়ে এসেছে এবং বিবাহ অনুষ্ঠানের খরচও সীমিত করেছে। ২০২০ সালে পরিচালিত এক জরিপে মপ্তি অঞ্চলের ১০০% নারী এবং ৯০% পুরুষ উত্তরদাতা স্বীকার করেছেন যে, এই পদক্ষেপ বিবাহের সুযোগ বাড়িয়েছে।
.
সিনিরে গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, ‘আগে যেখানে অর্থের অভাবে যুবকরা বিয়ে করতে পারত না, এখন সেখানে সহজেই তারা সংসার পাতার সুযোগ পাচ্ছে। অযৌক্তিক কনেমূল্য এখন নিষিদ্ধ।’
.
ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ সহজ করা একটি সওয়াবযোগ্য আমল। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সর্বোত্তম বিবাহ সেটি, যেটি সবচেয়ে সহজ।’ JNIM এই শিক্ষাকে বাস্তবায়িত করছে, যা স্থানীয় জনগণের প্রশংসা ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
.
নারীদের নিরাপত্তা ও অধিকার
পশ্চিমা গণমাধ্যম প্রায়ই ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে নারীদের জন্য নিপীড়নমূলক হিসেবে চিত্রিত করে। কিন্তু মালির বাস্তবতা ভিন্ন গল্প বলে। নারীরা নিজেরাই JNIM-এর শাসনে নিরাপত্তা ও সুবিচার খুঁজে পাচ্ছেন।
২০১৯ সালে মালি জুড়ে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, নারীদের ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোকে সমর্থনের প্রধান কারণ, শারীরিক সুরক্ষা। যৌন সহিংসতা যেখানে সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে JNIM কঠোর শাস্তির মাধ্যমে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
.
মপ্তির এক নারী জনপ্রতিনিধি ২০২০ সালে জানান, ‘অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী, এমনকি সরকারি বাহিনী যেখানে যৌন নির্যাতন করতো, সেখানে জিহাদিরা নারীদের সুরক্ষা দেয়। তাদের কোনো সদস্য এই ধরনের অপরাধ করলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।’
.
জোরপূর্বক বিবাহের মতো সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধেও তারা দাঁড়াচ্ছে। এক নারী বর্ণনা করেন, ‘যদি কোনো মেয়েকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়, সে তখন তাদের কাছে আবেদন করতে পারে এবং তার সম্মতির অধিকার বজায় রাখতে পারে।’
.
ইসলামি শরিয়া নারীদের অধিকার সুরক্ষিত করেছে। JNIM-এর আদালতগুলো সেই নীতি অনুসরণ করছে। পোশাক ও চলাফেরার কিছু বিধিনিষেধ থাকলেও, নারীরা মৌলিক নিরাপত্তা ও সম্মান পাচ্ছেন—যা রাষ্ট্রীয় শাসনে তাদের ছিল না।
.
সামরিক অভিযান কেন ব্যর্থ হচ্ছে?
সাহেল অঞ্চল জুড়ে যে সামরিক অভ্যুত্থানগুলো হয়েছে, সেগুলোকে অনেকে আশার চোখে দেখেছিল। ভাবা হয়েছিল, নতুন সামরিক নেতৃত্ব হয়তো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উন্নত করবে। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। মালির সামরিক সরকারের ‘পোড়ামাটি নীতি’—অর্থাৎ, নির্বিচার গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া ও বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা কেবল জনগণের ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
.
যখন কোনো শাসনব্যবস্থা জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন বিকল্প শক্তির উত্থান হয় স্বাভাবিক। JNIM ২০১৭ সাল থেকে সাহেল অঞ্চলের প্রায় ৬৪% সশস্ত্র ঘটনার সঙ্গে জড়িত হলেও, তারা শুধু সামরিক শক্তিতে বিশ্বাস করে না। তাদের শক্তির রহস্য লুকিয়ে আছে স্থানীয় জন-সমর্থনে।
.
এজন্য তারা মহাসড়ক অবরোধ করতে পারছে, জ্বালানি ট্যাঙ্কারে আগুন দিচ্ছে বা ব্যাপকভাবে সামরিক অবকাঠামো দখল করছে। এসব কিছু তাদের জনগণের মধ্যে প্রোথিত থাকার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ। যদিও পশ্চিমা বিশ্লেষকরা JNIM-কে ‘আফ্রিকার সবচেয়ে ভয়ংকর জিহাদি গোষ্ঠী’ হিসেবে দেখেন, বাস্তবে সাহেলের সাধারণ জনগণের মধ্যে এই সংগঠনের প্রতি গভীর আস্থা রয়েছে।
.
বর্তমানে তারা রাজধানী বামাকো অবরোধ করেছে। তাদের এই পদক্ষেপ গোষ্ঠীটির শক্তিমত্তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এটি যেকোনো গেরিলা আন্দোলনের সর্বোচ্চ পর্যায়, যখন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ সেই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করে।
.
ইসলামি শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ন্যায়বিচার (ইনসাফ), সামাজিক সাম্য এবং জনকল্যাণ। এই মানদণ্ডেই JNIM পুরোমাত্রায় সফল। তারা সাহেল অঞ্চলের ঐতিহ্যগত সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ভেঙে দিয়ে সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তাদের সব পদক্ষেপ নিখুঁত বা সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু যে জনগণ দশকের পর দশক ধরে অবহেলা, নিপীড়ন ও অবিচারের শিকার হয়েছে, তাদের জন্য JNIM শান্তির সুবাতাস নিয়ে এসেছে।
.
মালির পরিস্থিতি আমাদের শেখায় যে, কেবল বাহুবল দিয়ে কোনো জাতিকে দাবিয়ে রাখা যায় না। যদি রাষ্ট্র জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল না হয় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না করে, তবে বিকল্প শক্তির উত্থান অনিবার্য হয়ে ওঠে। এবং যে শক্তি জনগণের প্রকৃত সমস্যার সমাধান দেয়, তাকে দমন করা যায় না—তা সে যত শক্তিশালী সেনাবাহিনী দিয়েই হোক না কেন। (ইউকে বেইজড দি কনভারসেশনের জো এডেতুনজির আর্টিকেল অবলম্বনে।)
লেখক : গবেষক ও বিশ্লেষক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top