যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো পরীক্ষা দিচ্ছে গাজার শিক্ষার্থীরা। উপত্যকার শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনলাইনে এই পরীক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলের দক্ষিণে হামলার পর গাজা উপত্যকায় শুরু হয়েছিল ব্যাপক ইসরাইলি সামরিক অভিযান, যা এখনো চলছে। এই নৃশংস যুদ্ধ শুরুর পর গাজার শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। শিক্ষা অবকাঠামোর প্রায় ৯৫ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মতে, এই অঞ্চলের প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার শিশু শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
তবু এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই গাজার শিক্ষার্থীরা আবারো পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই শুরু করেছে। অবরুদ্ধ উপত্যকার শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমিক-স্কুল পরীক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি যুদ্ধ শুরুর পর গাজার শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা।
প্রায় ১,৫০০ শিক্ষার্থী এই চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন করেছে। পরীক্ষাটি ইলেকট্রনিক বিশেষ সফ্টওয়্যার ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে। পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
তবে বাস্তবতা কঠিন। কিছু শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে ঘরে বসে। আবার কেউ আশ্রয়কেন্দ্র। তাঁবু বা ক্যাফের মতো অস্থায়ী স্থানে বসেও পরীক্ষা দিচ্ছে। এসব স্থানে তারা কোনোভাবে একটি চার্জড ডিভাইস এবং ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা করছে। প্রতিদিনকার ইসরাইলি বোমাবর্ষণের ভয়ে তারা নিরাপদ স্থান খুঁজে পরীক্ষায় বসছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদক তারেক আবু আযম বলেন, এই পরীক্ষাগুলো শুধুমাত্র একটি শিক্ষামূলক ধাপ নয়। বরং ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা, বৃত্তি ও ইসরাইলি অবরোধের বাইরে একটি ভবিষ্যতের প্রবেশদ্বার। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রেও যেখানে কোনো শ্রেণিকক্ষ নেই, কোনো বই নেই এবং খুব একটা ইন্টারনেট নেই, গাজার শিক্ষার্থীরা আসছে, লগ ইন করছে এবং তাদের চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসছে। যুদ্ধ তাদের ভবিষ্যৎ মুছে ফেলতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।’
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি নতুন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে, যা গাজায় এই ধরণের প্রথম পদক্ষেপ। শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় আগে একটি মক টেস্ট নেয়া হয়েছিল, যাতে তাদের জ্ঞান যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাও যাচাই করা যায়।
তবে শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ এখনো প্রকট। দোহার এক শিক্ষার্থী খাতাব বলেন, ‘আমরা অনলাইনে পরীক্ষা দিচ্ছি, কিন্তু এটি খুবই কঠিন। ইন্টারনেট দুর্বল, আমাদের অনেকের কাছে ডিভাইস নেই এবং পরীক্ষা দেয়ার জন্য কোনো নিরাপদ স্থান নেই। বোমা হামলায় আমরা আমাদের বইও হারিয়েছি।’
এই সঙ্কট মোকাবিলায় কিছু শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত শ্রেইণকক্ষ খুলে ফেলেছেন এবং সশরীরে নির্দেশনা দিচ্ছেন। শিক্ষক এনাম আবু স্লিসা বলেন, ‘প্রথমবারের মতো মন্ত্রণালয় অনলাইনে এটি করেছে এবং শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত, তাই আমরা ধাপে ধাপে তাদের নির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করছি।’
এই পরিস্থিতিতে জাতিসঙ্ঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী গাজার শিক্ষা অবকাঠামো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছে। এই ধ্বংসযজ্ঞকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। অনেক জাতিসঙ্ঘ পরিচালিত স্কুল এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থলে রূপান্তরিত হয়েছে। সেগুলোও ইসরাইলি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। গাজার শিক্ষার্থীরা তা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রমাণ করছে যুদ্ধ আর ধ্বংসের মাঝেও তারা শিক্ষা আর সম্মানজনক ভবিষ্যতের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
সূত্র : আল জাজিরা




