আলী হাসান উসামা
কিতাবি জ্ঞান আলাদা আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আলাদা। রেড মওলানা ভাসানীর কিতাবি জ্ঞান কী ছিল? কিন্তু রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে বাহ্যত একজন ‘হুজুর’ হলেও কার্যত এক অনন্য জাতীয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন। এখানে এসেই অনেক কিতাবি জ্ঞান থাকা বহু হুজুরের সঙ্গেও তেমন কিছু না জানা রেড মওলানার পার্থক্য হয়ে যায়। রেড মওলানার সফলতার রহস্য কী ছিল? সংক্ষেপে বললে,
১. জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ এবং তাদের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি
ভাসানী ছিলেন একজন ভূমিহীন কৃষকের সন্তান এবং তিনি গ্রামীণ কৃষকদের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে পারতেন। তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ ও খে লা ফ ত আন্দোলনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে, তিনি কৃষক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তার রাজনীতি আবর্তিত করেন। ১৯২৯ সালে আসামের ব্রহ্মপুত্রের ভাসান চরে প্রথম কৃষক সম্মেলন আয়োজন করার পর থেকেই তিনি ‘ভাসানী’ নামে পরিচিত হন। সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিক-শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যার কারণে তিনি ‘মজলুম জননেতা’ উপাধি লাভ করেন।
২. সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী অবস্থান
ভাসানী আজীবন সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি জমিদার-জোতদার এবং সুদখোর মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। তিনি মনে করতেন, “শোষকের কোনো জাতি নাই, ধর্ম নাই, দেশ নাই, বর্ণ নাই—তার একমাত্র পরিচয় সে শোষক।” তার এই বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে।
৩. প্রগতিশীল ও দূরদর্শী চিন্তাভাবনা
বাহ্যত ‘হুজুর’ হওয়া সত্ত্বেও ভাসানী প্রগতিশীল চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন। তিনি নিজে কমিউনিস্ট না হয়েও কমিউনিস্টদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং বামপন্থী রাজনীতির প্রসারে অবদান রেখেছিলেন, যার কারণে তাকে “লাল মওলানা” নামেও ডাকা হতো। তিনি নিজের অজ্ঞতার কারণে ইসলামের সাম্যের বাণী এবং কমিউনিস্ট রাজনীতির সাম্যবাদের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখেননি এবং দ্বীনী বুঝের ঘাটতির কারণে অপচেষ্টা করেছেন এ দুয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে। দূরদর্শিতার উদাহরণ হলো, পঞ্চাশের দশকেই তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান একটি অচল রাষ্ট্রকাঠামো।
৪. আপসহীন ও প্রতিবাদী মনোভাব
রেড মওলানা ভাসানী শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করেননি। তিনি জানতেন যে মানুষের সংগ্রামী চেতনা তাদের অধিকার আদায়ে একমাত্র অস্ত্র হতে পারে। তিনি সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে প্রতিবাদ করতেন এবং তার রাজনৈতিক জীবনজুড়ে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যেমন, ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে তিনি পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের “ওয়ালাইকুম আসসালাম” বলে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।
৫. ভাষার অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে অবস্থান
মওলানা ভাসানী ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তিনি বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরালো দাবি জানিয়েছিলেন। প্রথম থেকেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের স্বায়ত্তশাসন ও অধিকারের পক্ষে ছিলেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
৬. সংগঠন গড়ার ক্ষমতা
তিনি ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠা করেন, যদিও আজকের লীগ তাকে ভুলেই গিয়েছে। এছাড়াও তিনি যুক্তফ্রন্ট গঠনে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন, যা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের দূর্গকে ধ্বসিয়ে দিয়েছিল। অনেকের সংগঠন ভাঙার ক্ষমতা থাকলেও গড়া ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারার লোকের বড়ই অভাব।
৭. সাধারণ মানুষের ‘পীর’ ও আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা
যদিও তিনি রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, সাধারণ কৃষকদের কাছে তিনি একজন আধ্যাত্মিক নেতা, তাদের ‘পীর’ হিসেবেও গণ্য হতেন। ইসলাম আর বাম রাজনীতির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে তিনি বাংলার স্বল্পজ্ঞানী শোষিত মানুষের প্রিয় মওলানা হয়ে উঠেছিলেন।




