সন্ত্রাসমুক্ত তুরস্ক, এরদোগানের সাফল্য, তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পিকেকে,এমএইচপি, একে পার্টি, এরদোগান

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ : এরদোগানকে দরকার ইউরোপের, তবে তুরস্ক বিনামূল্যে সেবা দেবে না

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউরোপ বড় ভূমিকা রাখলেও তুরস্ককে সরাসরি আলোচনায় দেখা যায়নি। আলাস্কায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক কিংবা হোয়াইট হাউসে মার্কিন-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে আঙ্কারার অনুপস্থিতি চোখে পড়েছে। তবুও যুদ্ধ-পরবর্তী সম্ভাব্য সমঝোতা এবং শান্তিরক্ষা ব্যবস্থায় তুরস্কের ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যায় না, কারণ কৃষ্ণ সাগর, সিরিয়া ও ইউরোপীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেশটির স্বার্থ জড়িত।

স্বাধীন নীতি কিন্তু প্রভাবশালী ভূমিকা

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ন্যাটো থেকে ভিন্নতর একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করে। তবে যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে আঙ্কারা আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছে। ট্রাম্পের ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পরপরই তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মার্কিন প্রতিপক্ষ মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। প্রেসিডেন্ট এরদোগানও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেন, যেখানে ইউক্রেন ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচিত হয়।

ম্যাক্রোঁ আগে বলেছিলেন, যুদ্ধ নিয়ে সমঝোতা হলে তুরস্ক ইউক্রেনে প্রতিষ্ঠিত নিরাপত্তা বাহিনীর অংশ হতে পারে। এদিকে, হোয়াইট হাউসের বিবৃতি ইঙ্গিত দেয় যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাশিয়ার অনমনীয় অবস্থানে অধৈর্য হয়ে উঠছেন। যদিও ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকে কোনও অগ্রগতি হয়নি, তবুও রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চল ধরে রাখার অধিকার এবং ইউক্রেনকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো প্রস্তাবগুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আঙ্কারা তার কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে—বিশেষ করে ইউরোপের নিরাপত্তা সহযোগিতা, কৃষ্ণ সাগরের নিরাপত্তা এবং সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে।

ইউরোপীয় নিরাপত্তায় তুরস্ক

ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তুরস্কের অংশগ্রহণের প্রশ্ন সময়ে সময়ে উঠে আসে। গত মার্চে রাষ্ট্রদূতদের জন্য আয়োজিত এক ইফতার ভোজে প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেন, *“তুরস্ক ছাড়া ইউরোপীয় নিরাপত্তা অকল্পনীয়।”* তিনি জোর দেন যে ইউরোপের বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে হলে তুরস্ককে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এই অবস্থান ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটও সমর্থন করেছেন। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলিকে আহ্বান জানান, তুরস্কের মতো সামরিক শক্তিধর দেশকে নিরাপত্তা সহযোগিতায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।

ইউক্রেনে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা হলে তুরস্ক এর অংশ হতে পারে। তবে আঙ্কারা স্পষ্ট করেছে, বিনা শর্তে বা বিনামূল্যে তারা এই ভূমিকা নেবে না। তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নে পূর্ণ সদস্যপদ, শুল্ক সহযোগিতা চুক্তি হালনাগাদ এবং সাইপ্রাস ইস্যুতে নীতিগত পরিবর্তনের নিশ্চয়তা চাইছে।

পরিহাসের বিষয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন একই সঙ্গে তুরস্ককে নিরাপত্তায় অন্তর্ভুক্ত করতে চায় এবং আবার রাশিয়ার পর সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবেও বিবেচনা করে—যা গত মার্চে ইইউর প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্রে উল্লেখ ছিল। এ অবস্থায় তুরস্ক স্পেন, পর্তুগাল, পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরির মতো দেশগুলির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিকল্প পথ খুঁজছে।

তবে ইউক্রেনে তুরস্কের যেকোনো সামরিক সম্পৃক্ততা মস্কো ও কিয়েভ উভয়ের সম্মতি ছাড়া সম্ভব নয়, এবং আঙ্কারা সরাসরি সামনের সারিতে সেনা পাঠাতে চাইবে না।

কৃষ্ণ সাগরের নিরাপত্তা

কৃষ্ণ সাগর ইউরেশিয়ার কৌশলগত কেন্দ্রস্থল। ট্রাম্প-পুতিন আলোচনার ফলাফলে যদি রাশিয়াকে ক্রিমিয়াসহ দখলকৃত অঞ্চল রাখার অধিকার দেওয়া হয়, তবে এই ভূগোলের ভারসাম্য পাল্টে যাবে।

২০১৪ সালে ক্রিমিয়া সংযুক্ত করার পর থেকে তুরস্ক রাশিয়ার এ পদক্ষেপকে কখনও স্বীকৃতি দেয়নি। আঙ্কারার মতে, এটি শুধু ভূ-কৌশলগত ভারসাম্যের জন্য নয়, বরং ক্রিমিয়ান তুর্কিদের অধিকার রক্ষার জন্যও জরুরি। একই উদ্বেগ রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার মতো সীমান্তবর্তী দেশগুলিতেও রয়েছে।

রোমানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাশিয়াকে ঠেকাতে তুরস্ক ও বুলগেরিয়ার সঙ্গে যৌথ নৌ নিরাপত্তা জোরদারের প্রস্তাব দিয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তুরস্ক কৃষ্ণ সাগরে ন্যাটো জাহাজের আধিপত্যের বিরোধিতা করে আসছে। আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে রাশিয়ান যুদ্ধজাহাজও সে পথে অতিক্রম করতে দেয়নি। গত এপ্রিলে তুরস্কের আয়োজিত বৈঠকে ২১টি দেশ অংশ নিয়ে কৃষ্ণ সাগরে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আঙ্কারার নেতৃত্ব অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

সিরিয়ার দিগন্তে বিপদ

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার মনোযোগ বিভক্ত হওয়ায় সিরিয়ায় আসাদ সরকারের জন্য তাদের সামরিক সহায়তা দুর্বল হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সমঝোতা হলে রাশিয়া আবার সীমিতভাবে সিরিয়ায় সক্রিয় হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (SDF) আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইছে, কিন্তু ইউরোপ তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আঙ্কারা মনে করছে, উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি দ্রুত নির্মূল করা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে বারবার নিরাপত্তা সংকট দেখা দেবে। তুরস্ক অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে জানে যে মার্কিন-রাশিয়া সমঝোতা প্রায়ই কুর্দি গোষ্ঠীগুলিকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।

অতএব, আঙ্কারাকে এবারই অমীমাংসিত নিরাপত্তা সমস্যাগুলো সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে এবং নতুন কোনো মার্কিন-রাশিয়ান সমঝোতার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

ইউরোপে নতুন সুযোগ, কৃষ্ণ সাগরে ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ এবং সিরিয়ায় সম্ভাব্য ঝুঁকি—এই তিন প্রেক্ষাপটে তুরস্কের ভূমিকা নির্ধারিত হবে। মার্কিন-রাশিয়ান সম্পর্কের যেকোনো পরিবর্তন সরাসরি তুরস্কের স্বার্থে প্রভাব ফেলবে। তাই আঙ্কারাকে অত্যন্ত সতর্কভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে।

সূত্র : আল জাজিরা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top