মানব সমাজের ইতিহাসে শরণার্থীর সমস্যা নতুন নয়। যুদ্ধ, নিপীড়ন, দারিদ্র্য ও বৈষম্যের কারণে মানুষ বারবার নিজভূমি ত্যাগ করে আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে যায়। বর্তমান বিশ্বেও লাখ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় শরণার্থীর অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত হলেও ইসলামে এই বিষয়ে বহু শতাব্দী আগে সুস্পষ্ট নীতি ঘোষণা করা হয়েছিল। মদিনায় হিজরত, মুহাজির ও আনসারের ভ্রাতৃত্ব এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের মানবিক শিক্ষার উজ্জ্বল উদাহরণ।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রতি ৭৭ জনের একজন শরণার্থী। ২০২১ সালের শেষে বিশ্বে শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৯ কোটি ৯৩ লাখে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পর তা ১০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। শরণার্থীদের সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো ১৯৪৯ সালের জেনেভা সম্মেলন থেকে শুরু হয়। পরে ১৯৫১ সালের জেনেভা কনভেনশন, ১৯৬৭ সালের সংশোধনী এবং ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (UDHR)-এর ১৪(১) অনুচ্ছেদ শরণার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করেছে।
১৯৫১ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী শরণার্থী হলো সেই ব্যক্তি, যিনি নির্যাতন, সংঘাত বা সহিংসতার কারণে নিজ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। ধর্ম, বর্ণ, জাতীয়তা, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা বিশেষ কোনো সামাজিক সম্প্রদায়ের কারণে শরণার্থীরা নিগৃহীত হওয়ার আশঙ্কা রাখে। এই আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক যুগের উদ্ভাবন হলেও ইসলামে বহু শতাব্দী আগে শরণার্থীর সুরক্ষার সুস্পষ্ট বিধান দেয়া হয়েছিল।
ইসলামে শরণার্থী বা আশ্রয়প্রার্থীকে ‘মুস্তামিন’ বলা হয়। মুস্তামিন ব্যক্তি মুসলিম বা অমুসলিম যেই হোন, তাকে আশ্রয়, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা প্রদানের নির্দেশ ইসলামে রয়েছে। মদিনার আনসাররা মুহাজিরদের প্রতি সর্বাত্মক সহায়তা ও সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন। তারা নিজেদের সমস্ত কিছু মুহাজিরদের খিদমতে উৎসর্গ করতেন। আল্লাহ তা’আলা তাদের সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম সারির অগ্রণী আর যারা তাদের যাবতীয় সত্কর্মে অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট আর তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তাদের জন্য তিনি প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত যার তলদেশে ঝরনাধারা প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই হলো মহা সফলতা। (সুরা তাওবা, আয়াত ১০০)
এই আয়াত ও ইতিহাস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, ইসলামে শরণার্থীদের প্রতি সদয় হওয়া এবং তাদের অধিকার রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের বিশ্বে যখন লাখো মানুষ যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও নিপীড়নের কারণে শরণার্থী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে, তখন মুসলমানদের কর্তব্য হলো মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা অনুসরণ করে শরণার্থীদের আশ্রয়, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। ইসলামের এই নীতি মানবতার মর্যাদা রক্ষা করে, সামাজিক সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠা করে এবং সমাজে শান্তি ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি করে।
শরণার্থীদের প্রতি সদয় হওয়া কেবল মানবিক নয়, বরং এটি সওয়াব ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ। ইসলামের শিক্ষার আলোকে আমরা শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ালে, মানবতার জয় নিশ্চিত হবে এবং সমাজ শান্তি ও সহমর্মিতায় সমৃদ্ধ হবে।




