কদরুদ্দিন শিশির
শেখ মুজিব বাংলাদেশের জন্য একটি ‘অক্সিমোরন’। বাংলাদেশের জন্মের আন্দোলনে আরও অনেকের সাথে মুজিব ছিলেন একজন নেতা। ফলে তাকে আপনার স্মরণে রাখতেই হবে; এবং সম্মান ও কৃতজ্ঞতার সাথেই। আবার বাংলাদেশের ইতিহাসে দু’বার ফ্যাসিজম কায়েম হয়েছিল- একবার মুজিব নিজে করেছেন তার ইমেজকে কাজে লাগিয়ে। দ্বিতীয়বার তার মেয়ে করেছেন বাবা মুজিবের ইমেজ বিক্রি করে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশি হিসেবে আপনি মুজিবকে ছাড়তেও পারবেন না, ধরতেও পারবেন না। এটা একটা মুশকিল। তাকে ছাড়তে পারবেন না। কারণ বাংলাদেশের জন্মের কথা স্মরণ করলেই আরো অনেকের সাথে সামনের সারিতে তার নাম আসবে। অন্যদের মতো তার প্রতিও কৃতজ্ঞতা আসবেই। আর তাকে আকড়ে ধরলে আপনি বাংলাদেশে আবারও নতুন করে ফ্যাসিজম কায়েমের ঝুঁকি তৈরি করবেন।
তাহলে এই সমস্যার সমাধান কী?
একটু অদ্ভুত ও রেডিকাল টাইপের শোনালেও আমার মতে, এর সমাধান হলো মুজিবকে (যার ইমেজকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া কাল্ট ধীরে ধীরে ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠে) রাজনীতিতে ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেয়া। মুজিব এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যান্য নেতাদেরকে বই পুস্তকে, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসে সম্মান জানানো হবে, তাদের প্রয়ান দিবসে শোক জানানো হবে, একাডেমিক আলোচনায়, ইতিহাসে তারা থাকবেন। সবই হবে রাষ্ট্রীয়ভাবে কিন্তু তাদের নাম কোন রাজনৈতিক দল ‘নিজেদের’ বলে ব্যানারে, পোস্টারে, প্রচারে ব্যবহার করতে পারবে না।
তবে এই নিষেধাজ্ঞা শুধু শেখ মুজিবের ক্ষেত্রে এবং তার এক সময়কার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের জন্য নয়। বরং স্বাধীনতা যুদ্ধের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ফিগার জিয়াউর রহমান এবং এর আগে পরেরও আরও কোনো মৃত ফিগারকে কোন রাজনৈতিক দল তাদের দলের ব্যানারে/পোস্টারে ব্যবহার করতে পারবে না। রাজনীতি করতে হবে জীবিতদের নিয়ে, জীবিতদের জন্য এবং ভবিষ্যত জেনারেশনের জন্য। অতীতের জাতীয় ফিগাররা জাতির সবার সম্পদ, তাদের ভালো মন্দসহই। এতে আস্তে আস্তে এই ফিগাররা ‘জাতির নেতা’ হয়ে ওঠবেন এবং তাদেরকে কোন দলের গণ্ডি থেকে বের করে তাদের প্রতি সবার সম্মান প্রদর্শন সম্ভব হবে। এই ফিগারদের কেন্দ্র করে এখন যেভাবে জাতি বিভক্ত থাকে আস্তে আস্তে তা কমে যাবে।
যদিও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত দুইবারের ফ্যাসিজম শুধু মুজিবের ইমেজকে কেন্দ্র করে হয়েছে, এবং অন্য জাতীয় নেতা যেমন জিয়াউর রহমানের ইমেজকে কেন্দ্র করে হয়নি, তবে ভবিষ্যতে যে হবে না তার তো গ্যারান্টি নেই (যদিও জিয়ার অনুসারীদের ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার মতো সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো নেই)। ফলে শুধু মুজিব নন, যে কোন অতীতের নেতার নাম কোন দলই তাদের দলের ব্যানারে ও কোন ধরনের প্রচারে যুক্ত করতে পারবে না।




