সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা কেন অপরিহার্য

মিরাজ মিয়া

একটা রাষ্ট্র কীভাবে রাষ্ট্র হয়ে উঠে? এই বিষয়টি অনেকেই আপনারা সহজে বুঝতে চেয়েছিলেন। তাই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের হস্তক্ষেপ থেকে পৃথক রাখার বিষয়টি সহজে বিস্তারিত তুলে ধরছি।

পৃথিবীজুড়েই একটা আধুনিক রাষ্ট্রের সরকারের কাজ হলো কেবল পলিসি গ্রহণ ও নীতি নির্ধারন এসব করা। আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ হলো সেগুলো বাস্তবায়ন করা। যেমন-রাজনৈতিক দলের কাজ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা, অপরদিকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের কাজ সেই নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা। এখন রাজনৈতিক দল যদি মনে করে নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যানটা আমার দলীয় হতে হবে, নির্বাচন কমিশনটা আমার দলের হয়ে কাজ করবে। তখন যেটা হবে ঐ রাজনৈতিক দলের পতন বা ক্ষমতা শেষ হবার সাথে সাথে ঐ নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠানটাও ভেঙে পড়বে। কারণ প্রতিষ্ঠানের লোকজন ঐ রাজনৈতিক দলের। দলের পতন হলে কমিশনটাও অকার্যকর হয়ে যায়।

রাষ্ট্রের সরকারের কাজ শিক্ষা খাতের উন্নয়নের জন্য একটা বাস্তবমুখী নীতি প্রণয়ন করা। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজ সেই নীতিটা মাঠপর্যায়ে সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করা। এক সরকারের পর আরেক সরকার আসবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঠিকই ফাংশনাল থাকবে। দুই সরকারের মাঝে পার্থক্য হবে নীতিগত ও পলিসিগত। এক সরকার বলবে আমি শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধি করবো, অপর সরকার হয়তো বলবে আমি শিক্ষাখাতে ভর্তুকি না দিয়ে বেসরকারীকরণ করবো। এখন সরকার যদি এই পলিসিগত জায়গায় থেকে বের হয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটার ভেতরেই ঢুকে পড়ে কিংবা যদি মনে করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যারা কাজ করে তারা সবাই আমার দলের লোক হবে, সেখানকার সকল কর্মচারী আমার দলদাস হবে, মন্ত্রণালয়ের সকল বাজেট আমার পকেটে ঢুকবে। তখন আর ঐ মন্ত্রণালয়টা ফাংশন করে না। রাষ্ট্রের যে কাজের জন্য মন্ত্রণালয়টা গড়ে তুলা হয়েছে সেই কাজটা হয় না। শিক্ষাব্যবস্থাটা ধ্বসে পড়ে। সরকার পরিবর্তন হলে নতুন সরকার আসলে পুরো মন্ত্রণালয়টা আবার তারমতো করে সেটআপ দিতে হয়। কিন্তু সরকাররা যদি মন্ত্রণালয়টাকে কেবল তাদের পলিসিগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যম হিসেবে রেখে স্বাধীন রাখে তাহলে এক সরকার যাবে, আরেক সরকার আসবে। কিন্তু আমার মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফাংশনাল থাকবে।

এভাবেই রাষ্ট্রের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ফাংশন করে। যেমন- দুদকের কাজ সরকারি দল, বিরোধী দল কিংবা রাষ্ট্রের যেকোনো নাগরিক দুর্নীতি করলে সেটার তদন্ত করে বের করা ফেলা। এখন রাজনৈতিক দল যদি মনে করে দুদকের ঐ চেয়ারম্যানটা আমার দলীয় আজ্ঞাবহ হবে তখন দেখা যাবে সেই দুদক সরকারি দলের নেতাকর্মীদের অবাধ দুর্নীতি নিয়ে নিরব থাকবে। কিন্তু বিরোধী দলের যৎসামান্য দুর্নীতিকে কিংবা মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে বিরোধী পোটেনশিয়াল নেতাকে দুর্নীতির দায়ে আটকে দিবে। এভাবে সরকার যখন পতন হবে ঐ দুর্নীতি দমন কমিশনটাও প্রতিষ্ঠান হিসেবে অকার্যকর হয়ে যাবে। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি নিরপেক্ষ লোকের পরিবর্তে দলদাস দিয়ে পরিচালিত হতো। দলের পতন মানে ঐ প্রতিষ্ঠানটিরও পতন।

একইভাবে রাষ্ট্রের বিচার বিবাগ, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, তথ্য কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, মহা হিসাবনিরীক্ষক সব প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে। যেকারণে দেখবেন হাসিনা পতনের পর রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হয়ে গিয়েছে। পুলিশ ডিজফাংশনাল হয়ে গিয়ে রাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলা চরমে পৌঁছেছিল, কারণ হাসিনা পতনের সাথে সাথে তার দলীয় পুলিশদেরও পতন হয়েছে। এভাবে সচিবালয় থেকে শুরু করে প্রতিটা দপ্তর, অধিদপ্তর, মন্ত্রনালয় সবকিছু অকার্যকর হয়ে গিয়েছে। একটা অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

অথচ রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে সম্পর্ক ছিল সরকার আসবে যাবে, কিন্তু রাষ্ট্র রাষ্ট্রের মতো করে চলবে। যুক্তরাষ্ট্রে বাইডেন গিয়েছে, ট্রাম্প এসেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কি অকার্যকর হয়ে গিয়েছিল? না হয় নাই। কারণ তাদের সেখানে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দলদাস মুক্ত। ব্রিটেনে ঋষি সুনাকের পতন হয়েছে, কিয়ার স্টারমার এসেছে। সেখানে কি পুলিশীব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে গিয়েছে? হয় নাই। কারণ পুলিশ একটা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফাংশন করছে। সরকারে কে আছে সেটা সেখানে মূখ্য নয়। সরকার আর প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশ যদি আলাদা না থাকে, সরকারি দলের কেউ অপরাধ করলে পুলিশ তো তাকে গ্রেফতার করবে না।

এখন বাংলাদেশে যদি আমাদের সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো আগের নিয়মেই চলে তাহলে আগামী বছর যারা ক্ষমতায় আসবে পুলিশ, প্রশাসন, দুদক, পিএসসি, দপ্তর, অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় সবকিছু ঐ নির্বাচিত দলের হয়ে কাজ করবে। ঐ সরকার চলে গেলে পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থা ঐ সরকারের সাথে সাথেই collapse করবে। যদি না প্রতিষ্ঠানগুলো দলদাসমুক্ত না হয়।

এভাবেই তখন রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সবকিছু একাকার হয়ে যায়।

আরও সহজ করে বুঝিয়ে বলি। ধরেন দুদক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বাধীন না। ধরেন দুদকে সরকারি দলের আজ্ঞাবহ কেউ বসে আছে, এখন দুদক যদি কোন অপকর্মে লিপ্ত হয় তখন আপনি তার সমালোচনা করলে বলা হবে সরকারের সমালোচনা করছেন। আপনার উপরে চলবে স্ট্রিম রোলার। ধরেন আপনি রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করছেন, তখন দলের কর্মীরা মনে করবে আপনি তাদের দলটাকেই সমালোচনা করছেন। মনে করেন বিচার বিভাগে সরকারের হস্তক্ষেপ আছে, এখন আপনি প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করলে ধরে নেওয়া হবে আপনি ঐ দলের, ঐ সরকারেরই সমালোচনা করছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকার সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তখন আর এটা রাষ্ট্র থাকে না। সরকারের পতন হলে পুরো রাষ্ট্রটাই অকার্যকর হয়ে পড়ে।

তাই একটা রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে তার সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাখতে হয়। সরকার ও নির্বাহী বিভাগ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুক্ত রাখতে হয়। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ যৎসামান্য করে ফেলতে হয়। সরকার আসবে যাবে, আমার রাষ্ট্র রাষ্ট্রের মতো কাজ করবে।

এখন যদি কেউ বিরোধী দলকে দমনপীড়ন করতে চায়, জোর করে ভোটকেন্দ্র দখল নিতে চায়, যদি রাষ্ট্রের চাকরি নিজ দলের কর্মীদের জন্য বরাদ্দ রাখতে চায়, যদি জনগণের সম্পদ দলীয় সম্পদে রূপান্তরিত করতে চায় তখনই কেবল অবাধ নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োজন। তখনই কেবল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বিরোধী দলের নেতাকে অকারণে মামলা দিবেন, এখন পুলিশ কমিশন স্বাধীন থাকলে সেখানে তো মিথ্যা মামলা নিবে না। দিনের ভোট রাতে করার জন্য ডিসিকে কল দিবেন। এখন প্রশাসন নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ মুক্ত হলে সে তো প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে বলবেন বিদেশে টাকা পাঁচার করে বাড়ি বানিয়ে দাও, এখন ব্যাংক নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ মুক্ত হলে সেটা তো সে করবে না। আশাকরি, এখন স্পষ্ট বুঝতে সক্ষম হয়েছেন যে, রাজনৈতিক দলগুলো ঠিক কী কারণে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের থেকে হস্তক্ষেপ মুক্ত করতে চায় না।

একটা রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করাতে চাইলে, সরকার ও রাষ্ট্রকে একাকার করে ফেলতে না চাইলে, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে আপনাকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে সম্পূর্ণ আলাদা করতেই হবে। যতদিন না প্রতিষ্ঠান ও সরকার সম্পূর্ণ পৃথক ততদিন এই রাষ্ট্র হয়ে উঠবে জুলুমকারী, গুমকারী, নাগরিক অধিকার হত্যাকারী।

যেকারণেই আজকের আগের লেখাটায় আমি বলেছি পিএসসি একটা সিরিয়াস কেইস। যেটার মাধ্যমে একটা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। এদেশেটা যারা পরিচালনা করবেন, যারা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বে থাকবেন তারা কিন্তু পিএসসির বিসিএস পরিক্ষার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আসেন। ৬৪ জেলার ডিসি এসপি সৎ ও যোগ্য হলে ঐ জেলাটা দুই বছরে পরিবর্তন হওয়া সম্ভব। ঐ জেলাটাকে চাঁদাবাজ মুক্ত করা সম্ভব। ঐ জেলার নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু করা সম্ভব। ঐ জেলার নাগরিকদের অযথা হয়রানি বন্ধ করা সম্ভব। এখন পিএসসিতে যদি সরকারের হস্তক্ষেপ থাকে, পিএসসির বিসিএস প্রক্রিয়া যদি দলের সুবিধানুযায়ী হয়। তখন দলের লোক ক্যাডার হবে, দলের লোক ডিসি এসপি হবে। অযোগ্য লোক দেশটাকে পরিচালনা করবে। দলের কথা শুনে সেই ডিসি এসপিরা দিনের ভোট রাতে করবে, বিরোধী দলকে দমনপীড়ন করবে, জেলার সবগুলো প্রতিষ্ঠান দলের হয়ে যাবে।

যেকারণে আজকে জাতীয় ঐক্যমত কমিশনে প্রস্তাবনা তোলা হয়েছে, এসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করে স্বতন্ত্র একটা নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে এসবের প্রধান নিয়োগ দিবে। পিএসসির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিবে না, নিয়োগ দিবে ঐ স্বতন্ত্র কমিটি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য একটা রাজনৈতিক দল এই আলোচনাটুকুই করতে চায় না। ওয়াকআউট করেছে। নির্বাহী বিভাগ থেকে এসব পৃথক করলে নাকি প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমে যায়। মানে রাষ্ট্র, সরকার, প্রতিষ্ঠানকে একাকার করে ফেলার বন্দোবস্ত। রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়ানোর যে সুযোগ জুলাই শহীদেরা এনে দিলো, আমরা পুরোপুরি সেটার সাথে প্রতারণা করতেছি।

মনে রাখবেন, এই রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াবে না। যতদিন না আমরা রাজনৈতিক দলগুলোকে এটা বোঝাতে সক্ষম হবো যে, অবাধ নির্বাহী ক্ষমতা চর্চা করা, সব প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা রাজনৈতিক দল বা সরকারের কাজ নয়। সরকারের কাজ পলিসি ও নীতি প্রণয়ন করা। আর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ সেসব পলিসি বাস্তবায়ন করা এবং পাঁচ বছরের জন্য যে সরকারটা আসে তাকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top