সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় সুয়েইদা প্রদেশের দ্রুজ আধ্যাত্মিক নেতা হিকমত আল-হাজরির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আহ্বান সিরিয়ার ভৌগোলিক কাঠামোর উপর একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যা ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদী ঔপনিবেশিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে। তার প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক ক্রসিং এবং সুয়েইদাকে কুর্দি নিয়ন্ত্রিত পূর্ব ইউফ্রেটিস অঞ্চলের সাথে সংযুক্ত করার প্রচেষ্টা সরাসরি ইসরাইলের সমর্থনপুষ্ট একটি ভূ-কৌশলগত পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।
ইসরাইলের স্বপ্ন : সুয়েইদা থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত করিডোর
হিকমত আল-হাজরি যখন দক্ষিণ সিরিয়ার সুয়েইদা এবং জর্ডানের মধ্যকার আন্তর্জাতিক রুট খুলে দেওয়ার পাশাপাশি উত্তরের কুর্দি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সাথে সংযোগ তৈরির আহ্বান জানান, তখন এটি ইসরাইলি বোমা হামলার পরে সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর ওই অঞ্চল থেকে প্রত্যাহারের পরপর ঘটে। তার এই বক্তব্য সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে একটি ইঙ্গিত হিসেবেই প্রতিভাত হয়েছে। এটি দামেস্কের কর্তৃত্ব থেকে সুয়েইদাকে আলাদা করে দেওয়ার একটি সম্ভাব্য সূচনা, যার পেছনে প্রত্যক্ষ ইসরাইলি সহায়তা রয়েছে।
দ্রুজ সম্প্রদায় ও ইসরাইলি হস্তক্ষেপ
যদিও আল-হাজরি নিজেকে দ্রুজ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেন, কিন্তু আল-হানাউই এবং জারবু সহ অন্যান্য আধ্যাত্মিক নেতারা ইসরাইলি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছেন। সম্মানিত সমাজ নেতাদের জোটের প্রধান শেখ লাইথ আল-বালাউস স্পষ্টভাবে আল-হাজরির অবস্থানের বিরোধিতা করেন এবং সিরিয়ার ঐক্যের প্রতি অনুগত থাকার আহ্বান জানান।
ইসরাইলের পরিকল্পনা : ‘ডেভিডস করিডোর’
ইসরাইল একটি ভৌগোলিক অক্ষ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে যা ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে গোলান হাইটস, দারা, সুয়েইদা, আল-তানফ, ইউফ্রেটিস এবং শেষ পর্যন্ত ইরাকি কুর্দিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই করিডোর ইসরাইলের কথিত বাইবেলীয় ইতিহাসের ‘দাউদের সাম্রাজ্য‘ প্রতিষ্ঠার ধারণার প্রতিফলন। যদিও এর কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক ভিত্তি নেই, ইসরাইল এটি বাস্তবায়নের জন্য সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও সংখ্যালঘুদের সহযোগিতা কাজে লাগাচ্ছে।
ভৌগোলিক কৌশল ও সম্প্রসারণ
এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন ইসরাইলকে সিরিয়ার অভ্যন্তরে গভীরভাবে অনুপ্রবেশ করতে সহায়তা করবে এবং একধরনের স্থলসেতু তৈরি করবে যা লেভান্ট অঞ্চল ও উত্তর ইরাকে পৌঁছাবে। এর মাধ্যমে সিরিয়া, ইরাক, ইরান ও লেবাননের মধ্যে যোগাযোগ ভেঙে পড়বে, যা ইসরাইলি দৃষ্টিকোণ থেকে ইরানপন্থী প্রতিরোধ আন্দোলনকে দুর্বল করবে।
দ্রুজ ও কুর্দিদের ব্যবহারের কৌশল
ইসরাইল এই করিডোর বাস্তবায়নের জন্য দ্রুজ ও কুর্দি সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করতে চায়, যাদেরকে কেন্দ্র করে পৃথক প্রশাসনিক সত্তা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা চলছে। দ্রুজ সংখ্যাগরিষ্ঠ সুয়েইদায় একটি স্বাধীন ইউনিট এবং পূর্বে ইউফ্রেটিসে একটি কুর্দি অঞ্চল তৈরি করার মাধ্যমে সিরিয়াকে জাতিগতভাবে বিভক্ত করা ইসরাইলের অন্যতম লক্ষ্য।
ভূরাজনৈতিক ফলাফল
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যে ফলাফলগুলি ঘটতে পারে তা হলো:
সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে বিভাজন,
ইরান-হিজবুল্লাহ যোগাযোগ লাইন ভেঙে দেওয়া,
দক্ষিণ তুরস্কে চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে আঙ্কারার নিরাপত্তা নীতি দুর্বল করা,
ফোরাত অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ এবং
ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত এলাকা বৃদ্ধির মাধ্যমে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ তত্ত্ব বাস্তবায়নের চেষ্টা।
ইসরাইলের অস্তিত্বের অজুহাত ও সম্প্রসারণনীতি
ইসরাইল তার ছোট ভৌগোলিক পরিসর, নিরাপত্তাহীনতা ও আরব দুনিয়ার মাঝে বিচ্ছিন্ন অবস্থানকে অস্তিত্বের হুমকির দোহাই দিয়ে ব্যবহার করছে। এর ফলে ইসরাইল আঞ্চলিক সম্প্রসারণ ও হস্তক্ষেপকে ‘নিরাপত্তা’ বলেই উপস্থাপন করছে। বাস্তবে এটি বাইবেলীয় পৌরাণিক কাহিনী ও পশ্চিমা সমর্থনকে ব্যবহার করে আরব ভূমিতে একটি সামরিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার পদক্ষেপ।
‘ডেভিডস করিডোর‘ একটি কল্পিত ইতিহাসের ওপর দাঁড়ানো প্রকল্প, কিন্তু এর বাস্তবায়ন প্রচেষ্টা সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, ইরান ও তুরস্কের জন্য একটি গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি। এটি ইসরাইলের ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিভাজন, দুর্বলতা ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বীজ বপন করছে। এর মাধ্যমে ইসরাইল শুধু সিরিয়ার ভূখণ্ড নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোতেই একটি বিস্ফোরক ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছে। তাই এটি শুধু সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং পুরো অঞ্চল জুড়ে একটি কৌশলগত প্রতিক্রিয়া দাবি করে।
সূত্র : আল জাজিরা




