২২ জুলাই আঙ্কারায় এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সিরিয়ার সুইডা শহরের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে এক কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি বিভক্তি এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে চান, তাহলে আমরা এটিকে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করব এবং হস্তক্ষেপ করব।’ এই বিবৃতি তিনি সালভাদোরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্দ্রা হিলের সঙ্গে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে দেন।
হাকান ফিদান তার শান্ত ও পরিমিত বক্তব্যের জন্য পরিচিত হলেও, এবারের বক্তব্য ছিল ব্যতিক্রমীভাবে কঠোর। এতে বোঝা যায়, তুরস্ক সিরিয়ার ভেতরে এবং পারিপার্শ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে এক গভীর হুমকি অনুভব করছে।
সুইডায় সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ফলে যে সতর্ক শান্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তার সত্ত্বেও এই পরিস্থিতি সিরিয়া ও তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক গভীর ছায়া ফেলেছে। পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই সংঘর্ষের পর ইসরায়েল ড্রুজ সম্প্রদায়কে রক্ষার অজুহাতে হস্তক্ষেপ করেছে, যার ফলে রাজধানী দামেস্কে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভবনে একটি বিশ্বাসঘাতক হামলা সংঘটিত হয় এবং সম্পূর্ণ ভবন ধ্বংস হয়ে যায়।
এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে ড্রুজ সম্প্রদায়ের ভেতরে বিচ্ছিন্নতাবাদী কণ্ঠস্বর জোরালো হয়েছে। ফিদান বিশেষভাবে উল্লেখ করেন শেখ আল-আকল হিকমত আল-হিজরির নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে, যারা ইসরায়েলের সহায়তায় দক্ষিণ সিরিয়া থেকে উত্তর-পূর্বে একটি করিডোর তৈরি করতে চাইছে, যা “ডেভিড করিডোর” নামে পরিচিত। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হচ্ছে সিরিয়ার অভ্যন্তরে দুটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চলকে সংযুক্ত করে তেল আবিবের প্রভাব বলয় বিস্তার।
এই প্রেক্ষাপটে আঙ্কারার উদ্বেগ সুস্পষ্ট। তুরস্ক মনে করছে, এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে তা একটি কৌশলগত বিপর্যয় ডেকে আনবে, যার অভিঘাত শুধু সিরিয়াতেই নয় বরং সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। ৯০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ তুর্কি-সিরিয়া সীমান্তের কারণে, এই বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে তুরস্কের উপরেই।
ফিদানের বক্তব্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আছে:
প্রথমত, তুরস্ক যেকোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তিনি দেশভাগের প্রচেষ্টাকে ‘একটি বড় কৌশলগত বিপর্যয়’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং বলেন, এই বিপর্যয় আঞ্চলিক অস্থিরতা, অভিবাসন সংকট, সন্ত্রাসবাদ ও অপরাধ বৃদ্ধির জন্ম দেবে। একই সঙ্গে সিরিয়ার পক্ষগুলিকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘অন্যদের দ্বারা নির্ধারিত খেলায়’ জড়ানোর কোনো অর্থ নেই এবং তাদের উচিত ‘নিজ ভূমির মর্যাদা ও নিরাপত্তার সাথে বসবাসকারী’ হওয়া।
দ্বিতীয়ত, তুরস্ক সরাসরি ইসরায়েলকে সিরিয়াকে অস্থিতিশীল করার জন্য অভিযুক্ত করে। ফিদান অভিযোগ করেন, ইসরায়েল সিরিয়ার আন্তর্জাতিক সমর্থনপ্রাপ্ত উত্তরণের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করতে চাইছে। এ জন্য তারা ড্রুজদের রক্ষার অজুহাতে হস্তক্ষেপ করছে এবং সিরিয়াকে টুকরো টুকরো করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যা ‘অস্থিতিশীল ও ভঙ্গুর’ এক নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করবে।
তিনি বলেন, ইসরায়েল এই কৌশল শুধু সিরিয়ার ক্ষেত্রেই নয়, বরং এই অঞ্চলের প্রতিটি প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধেও অনুসরণ করছে। ‘তুরস্ক এবং এই অঞ্চলের দেশগুলি ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নীরব থাকতে পারে না,’ বলে তিনি জোর দিয়ে জানান।
তৃতীয়ত, ফিদান ড্রুজ সম্প্রদায়ের বিদ্রোহকে হিকমত আল-হাজরির নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমিত রাখতে চান। তিনি এই গোষ্ঠীকে ‘ইসরায়েলের এজেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং অভিযোগ করেন যে আল-হাজরি ‘স্থিতিশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে অংশ নেওয়া প্রত্যাখ্যান করেছেন।’
আঙ্কারা চায় না এই আন্দোলন পুরো ড্রুজ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করুক। বরং, তুরস্ক দাবি করে যে তিনটি ড্রুজ উপদলের মধ্যে দুটি সিরিয়ান রাষ্ট্রকে সমর্থন করে। আঙ্কারার এই অবস্থানের ভিত্তি রয়েছে লেবাননের ড্রুজ নেতা ওয়ালিদ জুম্বলাতের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের উপর। জুম্বলাত ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তুরস্ক সফর করেন এবং সিরিয়ার নতুন প্রশাসনের প্রধান আহমেদ আল-শারার সঙ্গে সাক্ষাতের একদিন পর এরদোগানের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
ওই বৈঠকে, সিরিয়ার ভবিষ্যৎ সরকার কাঠামোতে ড্রুজদের একীভূতকরণ ও সমতার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে আলোচনা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু আল-হাজরির উপদলের আধিপত্য এবং ইসরায়েলমুখী অবস্থান এই প্রচেষ্টাগুলিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে আঙ্কারা কেবল সিরিয়ার ড্রুজ সম্প্রদায় বা SDF-এর কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছে না, বরং সামগ্রিকভাবে সিরিয়ার অখণ্ডতা রক্ষায় নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ করেছে। ফিদান ড্রুজ সম্প্রদায়কে ‘বিভাজন ছাড়া’ সংলাপে আহ্বান জানিয়েছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে তুরস্ক তাদের ন্যায্য দাবি পূরণে সর্বাত্মক সহায়তা দেবে। তবে সেই দাবি যদি ‘অগ্রহণযোগ্য বিভাজনের’ রূপ ধারণ করে, তবে তুরস্ক ‘হুমকির মুখে’ বসে থাকবে না।
ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা : অটোমান অতীতের স্মৃতি
ফিদানের বক্তব্যে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুস্মৃতি টেনে আনা হয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, কিভাবে ১৮শ ও ১৯শ শতাব্দীতে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দিয়ে বহিরাগত শক্তিগুলো অটোমান রাষ্ট্রকে দুর্বল করে তুলেছিল। সেই সময়ের চিন্তাধারা ও বিভাজনমূলক আদর্শ – যেগুলোর ফলে ব্যাপক রক্তপাত হয়েছিল – এখনও এই অঞ্চলে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ফিদান বলেন, এই চিন্তাগুলি এখন পুরনো হলেও আজও ‘এই ভূখণ্ডের প্রভাবশালী শক্তিগুলি’ এই চিন্তাগুলিকে প্রক্সি শক্তি গঠনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। এই অঞ্চল এখনও সেই রক্তাক্ত ইতিহাসের স্মৃতি বয়ে চলেছে, যেখানে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো উপনিবেশবাদী শক্তিগুলি স্থানীয় বিভাজনকে ব্যবহার করে ধ্বংস ডেকে এনেছিল। তিনি ইঙ্গিত দেন, আজকের দিনেও একই কৌশল নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
SDF ও YPG : কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা হুমকি
তুরস্ক দক্ষিণ সিরিয়ার ঘটনাবলীর প্রতি যতটা মনোযোগী, ঠিক ততটাই নজর রাখছে উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (SDF) এবং কুর্দিশ পিপলস প্রোটেকশন ইউনিট (YPG)-এর উপর। ফিদান স্পষ্ট করেন, এই বাহিনীগুলো সংঘাতকে উসকে দেওয়ার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘যখনই দক্ষিণে কিছু ঘটে, তখন আমরা দেখি প্রাক্তন শাসনের অবশিষ্টাংশ সম্মানিত সিরিয়ান আলাওয়াইদের উত্তেজিত করার জন্য এগিয়ে আসে। অন্যদিকে, YPG-কে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে দেখি।’ তিনি ইঙ্গিত দেন, এই ঘটনাগুলি পূর্বপরিকল্পিত এবং বহুপক্ষীয় নকশার অংশ।
এরপর স্থানীয় একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, SDF যেন অবিলম্বে সিরিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে একটি বাস্তব ও কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছায় এবং এই চুক্তির বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়। তুরস্ক আশাবাদী যে YPG, যেটি পিকেকের একটি শাখা, তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে।
তুরস্ক ঘোষণা করে, তারা আর ৪০ বছরের সংঘাত ও সময়ের অপচয় সহ্য করবে না। ফিদানের ভাষায়, ‘আমরা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত,’ এবং ভবিষ্যতে আর পিকেকে বা তার শাখাগুলির পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না।
সামরিক বার্তা : নতুন অস্ত্রের উন্মোচন
এই কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি তুরস্ক সামরিক দিক থেকেও নিজের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। সম্প্রতি তুরস্ক একাধিক উন্নত অস্ত্র উন্মোচন করেছে, যা এর আগ পর্যন্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এই অস্ত্রপ্রকাশকে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন, বিশেষ করে ইসরায়েল ও আঞ্চলিক পক্ষগুলোর উদ্দেশে।
নতুন অস্ত্রের মধ্যে অন্যতম
হাইপারসনিক টাইফুন ‘B4’ ক্ষেপণাস্ত্র: যার পাল্লা ৮০০ থেকে ২,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। তুর্কি স্থল বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল সেলকুক বায়রাক্টার ওগলু জানিয়েছেন, এটি বিশ্বের অন্যতম দ্রুততম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হয়ে উঠতে যাচ্ছে।
NEB-2 বোমা: এটি ৮০ মিটার ভূগর্ভ পর্যন্ত ভেদ করতে এবং ৭ মিটার পুরু উচ্চ ঘনত্বের কংক্রিট ধ্বংস করতে সক্ষম। মাত্র এক টন ওজনের এই বোমা F-16 যুদ্ধবিমান থেকেও নিক্ষেপযোগ্য।
ER-300 ক্ষেপণাস্ত্র: আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য এই ক্ষেপণাস্ত্র ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারে এবং এটি যুদ্ধবিমান ও ড্রোন থেকেও উৎক্ষেপণযোগ্য।
এই অস্ত্রগুলোর উন্মোচন এই বার্তাই বহন করে যে তুরস্ক শুধু প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত নয়, বরং আগাম প্রস্তুতি নিয়েই অবস্থান করছে।
সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট
প্রশ্ন রয়ে গেছে: তুরস্ক কি সত্যিই এই সতর্কবার্তাগুলোকে সামরিক পদক্ষেপে রূপ দেবে?
উত্তর সম্ভবত ইতিবাচক। কারণ, তুরস্কের দৃষ্টিতে আজকের সিরিয়ার বিভাজনের প্রচেষ্টা আঙ্কারার জন্য একই রকম হুমকি যা আগে তাদের নিজভূমিকে বিভক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতো।
তাই, যেমনটা ২০১৬ সালের আগস্টে দেখা গিয়েছিল, তুর্কি সেনাবাহিনী সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে হস্তক্ষেপ করে PKK-এর সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতাবাদী করিডোর গঠনের প্রচেষ্টা রুখে দেয়। কামিশলি থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত একটি টানা করিডোর গঠনের পরিকল্পনাকে ছিন্ন করে দেয় তারা।
আজ আবার তুরস্ক প্রস্তুত, এবং আগের চেয়েও বেশি দৃঢ়, যদি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে হুমকি সৃষ্টি করে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এবার তুরস্ক একা নয়। বরং সিরিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় আঞ্চলিক ঐকমত্য গঠিত হয়েছে – বিশেষত সৌদি আরব, কাতার ও জর্ডানের সঙ্গে।
এছাড়া, এই ঐক্য সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব – রাষ্ট্রপতি আহমেদ আল-শারার প্রশাসনের – প্রতি আস্থা প্রকাশ করে, এবং তুরস্ক সেই আঞ্চলিক কাঠামোর অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
ফিদানের কূটনৈতিক ভাষ্য ও তুরস্কের সামরিক প্রস্তুতি একত্রে এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। আঙ্কারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, সিরিয়াকে বিভক্ত করার যেকোনো চেষ্টাই এখন থেকে তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে। এই অবস্থানে আঞ্চলিক সমর্থনের পাশাপাশি সামরিক সক্ষমতাও যোগ হয়েছে। তাই প্রশ্ন এখন কেবল সতর্কতার নয়, সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার — এবং তা বাস্তবায়িত হলে অঞ্চলজুড়ে একটি নতুন কৌশলগত ভারসাম্য গঠনের সম্ভাবনা প্রবল।
সূত্র : আল জাজিরা




