সিরিয়া, ইসরাইল,

সিরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা : অতীত থেকে বর্তমান

মোস্তাফিজ তামিম

সিরিয়ায় শিক্ষার বিকাশের ধারা এক বিশেষ বাঁক নেয় সালজুক যুগে দামেস্কে প্রতিষ্ঠিত সাদারিয়া মাদ্রাসার মাধ্যমে (খ্রিস্টাব্দ ১০০১)। এর আগে জ্ঞানের প্রথম আশ্রয়স্থল ছিল মসজিদ; সেখানেই পাঠ, গবেষণা আর চিন্তার চর্চা হতো। সাদারিয়া মাদ্রাসা সেই ধারাকে নতুন রূপ ও কাঠামো এনে দেয়। এটি ছিল বাগদাদে নিযামুল মুলকের নিজামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠারও আরো আগের কাহিনী। মূলত সাদারিয়া মাদ্রাসার মাধ্যমেই সিরিয়ার জ্ঞানের মজলিসগুলো মসজিদকেন্দ্রিক পরিসর থেকে সুসংগঠিত মাদ্রাসাভিত্তিক ব্যবস্থায় বিকশিত হতে শুরু করে।

আইয়ূবী শাসনামল বিদ্যালয়গুলোর স্বর্ণযুগ

এই সময়ে বিদ্যালয়গুলো ওয়াক্তভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছিল, যা ছাত্রদেরকে শিক্ষা ও আবাসন উভয়ই প্রদান করতো। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু ফিকহ ও হাদিসেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এতে চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রকৌশল, জ্যোতির্বিদ্যা, সঙ্গীত, রসায়নও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া এগুলো মাযহাবভিত্তিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ছিল। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত লাভ করেছিলো।

দামেস্ক : ৯৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল আল-মাদরাসা আল-আযিযিয়া, আল-মাদরাসা আল-আদিলিয়া আল-কুবরা।

হালাবে ৫১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল আল-মাদরাসা আল-কামিলিয়া, আল-মাদরাসা আল-যাহিরিয়া।

মামলুক যুগ : সমৃদ্ধির সুসময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

মামলুকরা আইয়ুবী যুগের শিক্ষা-সংক্রান্ত সমস্ত কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল এবং এর বিস্তার ঘটিয়েছিল। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র স্থাপত্যশৈলী অবলম্বন করেছিল। এই যুগে বিদ্যালয়গুলো সংখ্যায় বেশি ছিল এবং জ্ঞানচর্চা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ মামলুক সুলতানরা জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী ছিলেন এবং তারা আলেমদের খুব সমাদর করতেন। তখনকার উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান মাদরাসা জাওযিয়া (১২৫৫খৃ.); আলজাঞ্ছনাকিয়া (১৪২১) ও মাদরাসায়ে যাহিরিয়া (১২৭৭)

সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়; সিরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় উসমানী শাসকদের নতুন সংযোজন

সরকারি বিদ্যালয়গুলো অটোমান সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো, পাঠ্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগও সরকার নিয়ন্ত্রণ করতো। যেমন: মাদরাসায়ে রুশদিয়্যা দামেস্ক, মাদরাসাতুল ইবাস (হিমস)।

বেসরকারী বিদ্যালয়গুলো স্থানীয় জনগণ বা বিভিন্ন সমিতির সহায়তায় পরিচালিত হতো। পাঠ্যক্রমে ছিল বেশি নমনীয়তা। যেমন: দামোভর বাণিজ্যিক স্কুল, হোমসের আর্থাডক্স স্কুল।

খ্রিস্টান মিশনারি বিদ্যালয়সমূহ

১৯ শতকে সিরিয়ায় বিদেশী খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। তারা দামেস্ক, হালাব ও হোমসে স্কুল স্থাপন করে। এসব স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি গণিত ও বিদেশি ভাষা পড়ানো হতো। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল হোমসের ইংরেজি স্কুল (১৮৫৫ খৃ.)। স্থানীয় উদ্যোগে স্কুল নির্মাণের মাধ্যমে জনগণ এই মিশনারীদের মোকাবিলা করে।

উপনিবেশ শাসনামন, ফরাসি সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি

ফরাসিরা তাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল সিরিয়ার পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের মাধ্যমে। তারা দেইর আল-জোরের আল-ফুরাত হাই স্কুলে এটা প্রয়োগ করেছিল। অনেক নতুন স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেছিল, যেমন ‘লিয়্যাক স্কুল’ (১৯২৯ খৃ.) যেখানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক এই তিন ধাপ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া তারা মিশনারি স্কুলগুলিকে অর্থায়ন ও পুনর্গঠন করেছিল, যেমন ফ্রান্সিসকান স্কুল (১৯২৫ খৃ.)।

উপনিবেশ শাসন থেকে মুক্তির পর..

স্বাধীনতার পর ১৯৫০ সালের সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয় যে শিক্ষা সব স্তরে বিনামূল্যে হবে এবং প্রাথমিক স্তরে বাধ্যতামূলক তাকবে। কিন্তু যখন বাথপার্টি ক্ষমতায় আসে, তখন তারা তাদের আদর্শকে দৃঢ় করার জন্য পাঠ্যক্রম ও স্কুল কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে এবং স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।

সূত্র : সুরিয়া আল আন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top