সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সিরিয়ার সোয়েইদা প্রদেশে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে, তা শুধু একটি গোষ্ঠীগত সহিংসতার ঘটনা নয়। বরং ড্রুজ সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ ও সিরিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তনের সঙ্কেত বহন করে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এই সংঘর্ষে ইতোমধ্যেই ৩০০ জনেরও বেশি প্রাণ হারিয়েছেন।
ড্রুজরা সিরিয়ার সোয়েইদা, জাবাল আল-আরব, সাহনায়া, জারামানা ও মাউন্ট হারমনের পাশাপাশি গোলান হাইটস, তুর্কি সীমান্তের কাছাকাছি এলাকাসহ লেবানন ও ইসরাইলের কিছু অঞ্চলে বসবাস করে। এদের অধিকাংশ সোয়েইদা ঘাঁটিকেই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে।
সঙ্ঘর্ষ ও চুক্তিভঙ্গ
সোয়েইদায় সঙ্ঘর্ষ চলাকালে সিরিয়ার বাহিনী যুদ্ধবিরতি তদারকির অজুহাতে শহরে প্রবেশ করে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা জানান, এ প্রবেশের পূর্বে সিরিয়ার পক্ষ থেকে ইসরাইলের সাথে একটি সমন্বয় হয়েছিল, যার শর্ত ছিল যেকোনো ভারী অস্ত্র আনা হবে না। কিন্তু সিরিয়া সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে ভারী অস্ত্র ব্যবহারের পথেই যায়।
ইসরাইলি প্রতিক্রিয়ায় এক সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ‘দক্ষিণ সিরিয়ার সাথে আমাদের সীমান্তে কোনো সামরিক স্থাপনা আমরা মেনে নেব না।’ এরই প্রেক্ষিতে বুধবার সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে বিমান হামলা চালানো হয়, যার লক্ষ্য ছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রপতি প্রাসাদসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
সাময়িক শান্তি ও সিরিয়ার অবস্থান
পরবর্তীতে সঙ্ঘর্ষ প্রশমনে একটি চুক্তির আওতায় সিরিয়া সরকার সোয়েইদা থেকে সেনা প্রত্যাহার করে এবং একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি ও অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়। পাশাপাশি, প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা একটি বক্তব্যে ড্রুজদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তিনি সিরিয়া রক্ষাকেই অগ্রাধিকার দেন এবং ইসরাইলের হস্তক্ষেপকে ‘ড্রুজদের সুরক্ষার অজুহাত’ বলে অভিহিত করেন।
মতপার্থক্য ও মূল্যায়ন
সাংবাদিক ইয়ামান আল-সায়েদ মনে করেন, প্রেসিডেন্ট আল-শারা এই বক্তব্যের মাধ্যমে সঙ্ঘর্ষ প্রশমনের বার্তা দিয়েছেন এবং সোয়েইদাকে ‘বিশেষ আচরণের’ আওতায় আনার জন্য স্থানীয় জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
অন্যদিকে, রাজনীতিবিদ ইয়াহিয়া আল-আরিদি মনে করেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ বিভাজন আরো গভীর করেছে এবং ড্রুজদের উপর দমন-পীড়নকে বৈধতা দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘ড্রুজরা ইসরাইলের এজেন্ট নয়’ এবং তাদের দানবায়ন করা হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ইসরাইলি ভূমিকা
ইসরাইলবিষয়ক সম্পাদক নিদাল কানানেহ বলেন, ড্রুজ সমাজের ভেতরে মতবিরোধ রয়েছে। গোলান হাইটসে তারা নিজেদের সিরিয়ার নাগরিক মনে করলেও সোয়েইদার পরিস্থিতি তাদের সেই বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তিনি জানান, ইসরাইল ড্রুজদের সাথে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী এবং সাম্প্রতিক সঙ্ঘর্ষ ইসরাইলি অবস্থানকে জোরদার করেছে।
তিনি আরো বলেন, ইসরাইলি নীতিতে সিরিয়া সংক্রান্ত লক্ষ্য নিয়ে মতবিরোধ নেই। বরং কৌশলগত উপায় নিয়ে আলোচনা চলে। ইসরাইলের আসল উদ্দেশ্য ড্রুজদের সামরিকভাবে নয়, আধ্যাত্মিকভাবে নিজের দিকে টানার চেষ্টা।
সোয়েইদা পরিস্থিতি, ইসরাইলের হস্তক্ষেপ, ও সিরিয়ার অবস্থানের প্রেক্ষিতে ড্রুজ সম্প্রদায় এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ভেতরে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতা, এবং বহির্বিশ্বের কৌশলগত খেলায় এই সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। সিরিয়া ও ইসরাইলের সংঘর্ষের মাঝে ড্রুজ জনগণ যেন এক অনাকাঙ্ক্ষিত জিওপলিটিকাল বোঝা বয়ে নিয়ে চলেছে।
সূত্র : স্কাই নিউজ




