সাঈদ আবরার
সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, “আমরা তাদের মতো নই যারা যুদ্ধকে ভয় পায়, বরং আমরা বিশৃঙ্খলার ওপর জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছি, এবং আমাদের সেরা পছন্দ ছিল মাতৃভূমির ঐক্য রক্ষা করা।”
.
সিরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদের পতনের পর ইসরঈলের বিমান হামলায় দেশটির বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী এবং ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের ৭০-৮০% ধ্বংস হয়েছে। তবে, সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব, হায়াত তাহরির আল-শাম (HTS), তাদের সামরিক কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। HTS একটি পেশাদার সামরিক একাডেমি পরিচালনা করে, যেখানে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্যরা প্রশিক্ষণ দেয়। তারা স্পেশাল ইউনিট তৈরি করেছে, যারা গোপন অভিযান, রাত্রিকালীন অপারেশন এবং দ্রুত আক্রমণে দক্ষ।
.
সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর হাতে ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী লঞ্চার, রাইফেল, ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (IED), এবং ড্রোন রয়েছে। এই অস্ত্রগুলো গেরিলা যুদ্ধের জন্য উপযোগী এবং হামাসের আল-কাসসাম ব্রিগেডের অস্ত্রের তুলনায় উন্নত।
.
সিরিয়ার জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি সম্প্রদায় (প্রায় ৭৪%) এবং অন্যান্য গোষ্ঠী, যেমন হাউরানি বেদুইন (২০ লক্ষের বেশি), প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিতে সক্ষম। এই জনশক্তি ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, যা তাদের গেরিলা যুদ্ধে দক্ষ করে তুলেছে।
.
গাজা থেকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে বিতাড়িত করে ২০০৭ সাল থেকে ২০২৩ সালের আকসা ফ্লাড পর্যন্ত প্রতিরোধের জন্য একটি জনপ্রিয় ভিত্তি তৈরি করতে হামাসের ১৬ বছর লেগেছিল। এই সময়ে তারা আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্ভাব্য আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। আর এসব কিছু করা হয়েছিল ক্ষুদ্র, অবরুদ্ধ গাজায়। সিরিয়ার ক্ষেত্রে, ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং জনসংখ্যার আকার (প্রায় ২২ মিলিয়ন) এটিকে আরও শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদান করে। হামাসের তুলনায় সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র মজুদ এবং যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বেশি।
.
অন্যদিকে, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো এক মাসেরও কম সময়ে সরকারি ভবনগুলোতে হামলা চালিয়ে আফগানিস্তান দখল করতে সক্ষম হয়েছিল, যখন তালিবান সেনাবাহিনী পাহাড়ের দিকে পালিয়ে গিয়েছিল এবং জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। কিন্তু বিদেশি দখলের বিরুদ্ধে আফগান প্রতিরোধ ২০ বছর ধরে চলমান থাকে। যতক্ষণ না আমেরিকানরা, যারা সম্ভবত তাদের প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি, আর মানবিক ক্ষতি সহ্য করতে পারছিল না। তারা সরে এসেছিল, এবং তিন মাসেরও কম সময়ে তালিবান আফগানিস্তান পুনরুদ্ধার করে।
.
//ইসরঈলের উদ্দেশ্য: দখল নাকি অপসারণ?
সিরিয়ায় ইসরঈলের (এবং এর পেছনে থাকা পশ্চিমাদের) উদ্দেশ্য কী? সরাসরি দখল? নাকি একমাত্র অ-পশ্চিমা অনুগত আরব সরকারকে অপসারণ? এটি একটি অসম্ভব উচ্চাকাঙ্ক্ষা। যদি প্রশ্ন রাখা হয়, একটি আক্রমণকারী বাহিনী দ্বারা সিরিয়া দখল করা কী সম্ভব? উত্তর হবে, হ্যাঁ। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এবং দখলের লক্ষ্যই হলো নিয়ন্ত্রণ।
.
সিরিয়ার প্রতি ইসরঈলের কৌশলগত উদ্দেশ্য বহুমাত্রিক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদের পতনের পর ইসরঈল সিরিয়ার সামরিক অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে দিমাশক ও হামা প্রদেশের বিমানবন্দর এবং সামরিক স্থাপনা। ইসরঈলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, “আমাদের সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের কোনো ইচ্ছা নেই, তবে আমরা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।” এই বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ইহূদি সন্ত্রাসীদের প্রাথমিক লক্ষ্য সিরিয়াকে একটি দুর্বল ও খণ্ডিত রাষ্ট্রে পরিণত করা, যাতে এটি ইসরঈলের জন্য হুমকি না হতে পারে।
.
ইসরঈল ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে জিলান মালভূমি দখল করেছিল এবং ১৯৮১ সালে এটিকে সংযুক্ত করে। ২০২৪ সালে আসাদের পতনের পর ইসরঈল জিলানের বাফার জোনের বাইরে সিরিয়ার অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করে।
.
ইসরঈল এবং পশ্চিমা শক্তিগুলো সিরিয়াকে ইরানের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে চেয়েছে। আসাদ সরকার ইরান ও রাশিয়ার সমর্থন পেত, যা ইসরঈলের জন্য কৌশলগত হুমকি ছিল। নতুন নেতৃত্বের অধীনে সিরিয়ার সঙ্গে আলোচনা শুরু হলেও, ইসরঈল এখনও সিরিয়ার সামরিক পুনর্গঠনকে বাধা দিচ্ছে।
.
//সিরিয়ার প্রতিরোধ কৌশল: গেরিলা যুদ্ধের সম্ভাবনা
সিরিয়ার ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত বৈচিত্র্য এটিকে গেরিলা যুদ্ধের জন্য আদর্শ করে তোলে। গাজার বিপরীতে, যেখানে হামাস সীমিত এলাকায় অবরোধের মধ্যে লড়াই করছে, সিরিয়ার বিস্তৃত ভূখণ্ড এবং পাহাড়ি এলাকা প্রতিরোধ যুদ্ধের জন্য সুবিধাজনক।
.
কেউ কেউ ভাবতে পারেন সিরিয়া প্রস্তুত নয়, কারণ এর বিমান প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান বাহিনীর অভাব রয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তানেরও এসবের কিছুই ছিল না। এবং সিরিয়ার কাছে এগুলো থাকলেও কোনো পার্থক্য হতো না। একটি স্বাধীন আরব রাষ্ট্রের বিমান বাহিনী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, পশ্চিমাদের কাছে আরও ভালো ও উন্নত বিমান বাহিনী এবং আক্রমণ সক্ষমতা রয়েছে।
.
যেহেতু আক্রমণের লক্ষ্য হলো দখল, এবং দখলের লক্ষ্য হলো নিয়ন্ত্রণ, তাই এর জন্য মাটিতে সেনা মোতায়েন প্রয়োজন, যা গেরিলা যুদ্ধের দিকে পরিচালিত করবে। কিন্তু সিরিয়া ক্ষুদ্র বা অবরুদ্ধ গাজা নয়, যেখানে দুই বছর পরেও ইসরঈলি সেনাবাহিনী যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করা এবং হামাসকে নির্মূল করার ঘোষিত উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
.
সিরিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি জনগোষ্ঠী, যারা ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে রুশ ও ইরানি হামলার মুখে প্রতিরোধ করেছে, তাদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীনতার প্রতি দৃঢ় মনোভাব রয়েছে। প্রেসিডেন্ট আল-শারা’র বক্তব্য এই মনোভাবকে প্রতিফলিত করে।
.
সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো গেরিলা কৌশল, অতর্কিত হামলা, সুড়ঙ্গ নির্মাণ এবং IED ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করেছে। এই অভিজ্ঞতা তাদের হামাসের তুলনায় আরও শক্তিশালী করে। এছাড়া জনগণের প্রতিরোধ মনোভাব এবং ভৌগোলিক সুবিধা দীর্ঘমেয়াদি দখলকে অসম্ভব করে তুলবে।
.
//সমরবিদ্যা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভাষ্য
সিরিয়ার সম্ভাব্য প্রতিরোধ কৌশল হবে অপ্রতিসম যুদ্ধ, যেখানে তারা ইসরঈলের উন্নত সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে গেরিলা কৌশল ব্যবহার করবে। এটি হামাসের গাজার কৌশলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, তবে সিরিয়ার বৃহত্তর ভূখণ্ড এবং জনশক্তি এটিকে আরও কার্যকর করতে পারে।
.
সিরিয়ায় সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কম। দ্রুজদের সংখ্যা প্রায় ৮০০,০০০। যেখানে শুধুমাত্র হাউরানি বেদুইনদের সংখ্যাই ২০ লক্ষের বেশি। এবং যারা সিরীয়দের সাথে যুদ্ধ করেছে তাদের বেশিরভাগই ছিল ইরান, ইরাক, লেবানন, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান (হেরাত থেকে) থেকে আসা বিদেশি শিয়া মিলিশিয়া। ইসরঈল দ্রুজ সম্প্রদায়কে সমর্থনের অজুহাতে হস্তক্ষেপ করেছে, কিন্তু শুধু দ্রুজদের দিয়ে সে সুবিধা করতে পারবে না।
.
ইসরঈলের সামরিক শক্তি উন্নত হলেও, দীর্ঘমেয়াদি দখল বা গেরিলা যুদ্ধে জড়ানোর জন্য তাদের জনশক্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা সীমিত। গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে দুই বছরের যুদ্ধে ইসরঈলের ব্যর্থতা এই দুর্বলতার প্রমাণ।
আসাদের পতনের পর ইরান ও রাশিয়ার সমর্থন কমে গেছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে এবং ইরান ইসরঈলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত থাকায় সিরিয়ায় তাদের প্রভাব হ্রাস পেয়েছে।
.
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে এবং ইসরঈল-সিরিয়া আলোচনায় মধ্যস্থতা করছে। তবে, মার্কিন নীতি সিরিয়াকে দুর্বল ও খণ্ডিত রাখার দিকে ঝুঁকছে।
.
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্দান ইসরঈলের জিলানে বাফার জোন দখলের নিন্দা করেছে, যা সিরিয়ার পক্ষে আঞ্চলিক সমর্থন বাড়ায়।
.
সিরীয়রা (সংখ্যাগরিষ্ঠ), ১৪ বছর ধরে নিরন্তর রুশ বিমান হামলা, আসাদ শাসন এবং ইরানি মিলিশিয়াদের বোমাবর্ষণের অধীনে বসবাস করছে, এবং তা সত্ত্বেও তারা যুদ্ধ বন্ধ করেনি।
.
সিরিয়ায় আক্রমণ হবে ইসরঈলের জন্য চরম বিপর্যয়কর। তারা সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করে তাদের যুদ্ধে জেতার চেষ্টা করছে, যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র ইরানি সহযোগিতায় ইরাকে শিয়া মিলিশিয়া তৈরি করে করেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো আফগানিস্তানে করেছিল। কিন্তু এখানে তারা সে সফলতা পাবে না৷
.
সিরিয়ার সেনাবাহিনী এবং সিরীয়রা (সংখ্যাগরিষ্ঠ) ভারী অস্ত্রে সজ্জিত, আল-কাসসামের চেয়েও উন্নত অস্ত্রে সজ্জিত, এবং তাদের গাজার যোদ্ধাদের মতোই একই আদর্শ রয়েছে। তারা একই ডিএনএ-এর অধিকারী। যদি গাজার অবরুদ্ধ যোদ্ধারা দুর্বল ইসরঈলি সৈন্যদের আত্মহত্যার কথা ভাবিয়ে থাকে, তাহলে ভেবে দেথুন, লক্ষ লক্ষ সশস্ত্র, অভিজ্ঞ সিরীয়দের মুখোমুখী হলে কী হবে, যারা গাজার যোদ্ধাদের কার্বন কপি অথবা তাদের উস্তাদ?
.
ইসরঈল যদি সিরিয়ার সঙ্গে ফুলস্কেল ওয়ারে জড়িয়ে যায়, তবে তা হবে সন্ত্রাসী ইসরঈলের পতনের কফিনের শেষ পেরেক ইনশাআল্লাহ৷
লেখকের ফেসবুক থেকে গৃহীত




