আবু নাইম ফয়জুল্লাহ
পুঁজিবাদী সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে দুইটি কবিরা গোনাহের উপর। সুদ ও অপচয়। কারণ, উৎপাদনের জন্য পুঁজি দরকার, আর পুঁজি আসে সুদভিত্তিক ব্যাংকলোন থেকে। অপরদিকে বিপণনের জন্য চাহিদা দরকার। আর মানুষের মাঝে অতিরিক্ত ভোগের মানসিকতাকে চাগিয়ে দিয়ে অপচয়ের মাঝে ডুবিয়ে রাখতে না পারলে উৎপাদিত পণ্যের সমপরিমাণ চাহিদা তৈরি করা সম্ভব না।
সুদ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, সুদ পরিত্যাগ না করলে তোমরা আল্লাহ ও তার রাসুলের সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। আর অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই আখ্যা দিয়েছেন। সুদ আল্লাহর দেয়া মনুষ্য সসাজের স্বাভাবিক ইকোসিস্টেমকে বদলে দিয়ে সম্পদকে কুক্ষিগত করে ফেলে। যার কারণে আজ পৃথিবীর ৯৫% সম্পদ ৫% মানুষের হাতে এসে পড়েছে। আর ৫% সম্পদের মালিক বাকী ৯৫% মানুষ।
আর অপচয় পৃথিবীর প্রাকৃতিক সিস্টমকে চ্যালেঞ্জ করে। পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদকে ভারসাম্যহীন করে তোলে।
পুঁজিবাদের রাজত্ব শুরু হওয়ার পর পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের যে ভারসাম্যহীন ব্যবহার আমরা লক্ষ করেছি তা পৃথিবীর লক্ষ বছরের ইতিহাসে নেই।
যেমন, পানির ব্যবহারের বিষয়টাই লক্ষ করেন। পৃথিবীতে পানি খুবই সীমিত। ৯৭ ভাগ পানি সাগর মহাসাগরে আছে, যা ব্যবহারের অযোগ্য। ২ ভাগ পানি মেরু অঞ্চল ও বিভিন্ন শীতল অঞ্চলে বরফ আকারে জমা আছে। বাকী ১% পানির উপরই পুরো মানব জাতি ও প্রাণীজগৎ নির্ভরশীল। ভূগর্ভস্থ পানিও সেই এক শতাংশের অন্তর্ভুক্ত।
জনসংখ্যা যতই বাড়ুক সকলের জন্য এই পানিই যথেষ্ট। কিন্তু যখন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পানি উত্তলন করা হবে তখন এর উপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। কারণ, তখন ব্যবহার ও রিসাইকেলের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
পুঁজিবাদ আসার পর থেকে যত দিন যাচ্ছে ততই এই ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ৫০ বছর আগেও প্রতিটা মানুষকে তার প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহের জন্য কিছু না কিছু পরিশ্রম করতে হতো। অন্তত টিউবওয়েল চাপতে হতো। কিন্তু এখন হাতের এক আঙ্গুলের সামান্য ইশারায় গলগল করে পানি বেরিয়ে আসে, এবং মনে হয় এই পানি অফুরন্ত। ফলে প্রতিটা মানুষ অন্তত ১০ গুণ বেশি পানি ব্যবহার করে। দুঃখজনক হলো, অতিরিক্ত ব্যবহারটাই এখন স্বাভাবিক ব্যবহারে পরিণত হয়েছে। আমরা অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করি, তা বুঝে আসে যেদিন বিদ্যুতের সমস্যার কারণে পানি থাকে না সেদিন।
শিল্পায়নের এই যুগে আমরা নিজেদের অগোচরেই পানির আরেকটা মারাত্মক ব্যবহার করে থাকি। সেটা হলো, আমরা কারখানায় তৈরি যা-ই ব্যবহার করি তার পেছনে আছে বিশাল পানির ব্যবহার।
আপনি যে টি-শার্ট পরে আছেন তা তৈরি হয়ে আপনার পর্যন্ত আসতে বিভিন্ন ধাপে পানি খরচ হয়েছে প্রায় ২৮০০ লিটার।
৬০০ মিলির একটা কোমল পানীয় পান করা মানে শুধু ৬০০ মিলি পানি পান করা না, বরং এর পেছনে আছে ২৬ লিটার পানি। এক কাপ কফি মানে এক কাপ পানি না, বরং এখানেও আছে অন্তত ৫৪ লিটার পানি।
আপনি হয়ত প্রয়োজনের তুলনায় একশ টাকার একটা টি-শার্ট বেশি ব্যবহার করছেন। কিন্তু আসলে আপনি ২৮০০ লিটার পানি অপচয় করছেন।
এভাবে আমাদের ব্যবহৃত আইটেমগুলো দেখুন, কত বেশি জিনিসপত্র আমরা ব্যবহার করি। আপনার বাসায় কত আইটেমের সাবান ব্যবহার করা হয়? গোসলের সাবান, শ্যাম্পু, ফেসওয়াশ, হ্যান্ডওয়াশ, গুড়া সাবান, লিকুইট সাবান, কাপড় ধোয়ার সাবান, আবার বাসন মাজার জন্য ভিম সাবান, বাচ্চাদের জন্য আলাদা বেবীসোপ। এগুলো শুধু নিত্য প্রয়োজনীয় সাবান আইটেম। অথচ এই নিত্য প্রয়োজনের লিস্ট পুঁজিবাদ আসার আগে কত ছোট ছিলো ভেবে দেখুন। মাত্র দুইটা সাবানেই আমাদের চলতো, একটা গোসলের, একটা কাপড় ধোয়ার সাবান, ব্যস।
এই প্রতিটা আটেমের পেছনে আছে মাত্রাতিক্ত পানির ব্যবহার, কাগজ ও প্লাস্টিকের ব্যবহার।
প্রতি বছর প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক তৈরি হয়। অথচ মাত্র ৭০ বছর আগে ১৯৫০ সালে সারা পৃথিবীতে বছরে প্লাস্টিকের উৎপাদন হতো মাত্র ২০ লাখ টন।
৪৫০ টন প্লাস্টিকের ৪০শতাংশই আমার আপনার ব্যবহৃত জিনিসপত্রের প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যবহার হয়। ফলে প্রতি বছর ৩০০ টন প্লাস্টিক বর্জ তৈরি হচ্ছে। এর মধ্য থেকে মাত্র ৯% রিসাইকেল হয়। বাকী সমস্ত বর্জ পৃথিবীকে নষ্ট করার জন্য পৃথিবীতে রয়ে যায়। প্লাস্টিক বর্জ মাটিতে পঁচে না। ৫০০ বছরেও মাটি প্লাস্টিককে পুরোপুরি হজম করতে পারে না।
এভাবে আমার আপনার সামান্য সুবিধার বিপরিতে ভয়ংকর এর চিত্র অঙ্কিত হচ্ছে পৃথিবীর প্রকৃতিতে।
এভাবেই আমাদের অপচয়, ভোগ ও মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা পৃথিবীর ন্যাচারকে বিপর্যস্ত করতে ভূমিকা পালন করছে।
এবার হয়ত বুঝতে পেরেছেন, অপচয়কারীকে আল্লাহ কেন শয়তানের ভাই বলেছেন।
শেষ করার আগে নিচের আয়াত দুটো একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ুন—
‘নিশ্চয়ই অপচয়কারী শয়তানের ভাই, আর শয়তান তার রবের চির অকৃতজ্ঞ।’ [সুরা বনি ইসরাইল : ২৭]
অন্য আয়াতে শয়তানের চ্যালেঞ্জ এবং আল্লাহর জবাব এভাবে এসেছে— (শয়তান চ্যালেঞ্জ করে বললো) ‘আমি অবশ্যই মানুষকে আদেশ করবো, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে (প্রাকৃতিক সিস্টেমকে) বদলে দিবে।’ (আল্লাহ বলেন) আর যে শয়তানকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে সে মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে পতিত হবে। [সুরা নিসা:১১৯]




