সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি ছবি ও ভিডিওর উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব কনটেন্ট এতটাই বাস্তবসম্মত মনে হয় যে সাধারণ ব্যবহারকারীদের পক্ষে সেগুলো জাল না আসল তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের মেট গালাকে কেন্দ্র করে গায়িকা কেটি পেরির একটি ভাইরাল ছবির ঘটনাই এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ছবিটি এক্স-এ ১ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়। কিন্তু পরে জানা যায়, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। ছবিতে ব্যবহৃত কার্পেট ছিল ২০১৮ সালের। আর কেটি পেরি নিজেও নিশ্চিত করেন যে তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
একইভাবে গত মে মাসে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে একটি ক্যাঙ্গারুকে বোর্ডিং পাস হাতে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। পরবর্তীতে আরো একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে যেখানে সেই ক্যাঙ্গারুকে বিমানে বাদাম খেতে দেখা যায়। এগুলো বাস্তব বলে মনে হলেও পরে বিশ্লেষণে দেখা যায় ভিডিওগুলো এআই-জেনারেটেড।
এই ধরনের কনটেন্ট সনাক্ত করতে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ এবং কৌশল ব্যবহার করা যায়।
এআই জেনারেটেড ছবি ও ভিডিওতে সাধারণত সূক্ষ্ম ত্রুটি দেখা যায়। যেমন আঙুলের অস্বাভাবিকতা, বিকৃত লেখা, অস্বাভাবিক ছায়া ইত্যাদি। ক্যামেরার কোণ বা গতিবিধি কিছুটা অস্বাভাবিক হতে পারে। ছবির পেছনের ছোট ছোট উপাদানগুলো যেমন বোর্ডিং পাসের লেখা বা পটভূমির প্রতিচ্ছবি ঘনিষ্ঠভাবে খেয়াল করলেই ভুল ধরা যায়।
অতিরিক্ত বাস্তবতা লক্ষ্য করুন
মানবীয় ত্রুটি যেখানে বাস্তব চিত্রের একটি স্বাভাবিক অংশ, সেখানে এআই কনটেন্টে সবকিছু প্রায় নিখুঁত ও সমমিত থাকে। ছবি অত্যধিক নিখুঁত দেখালে সন্দেহ হওয়া উচিত। মুখমণ্ডলের অতিরিক্ত মসৃণতা, নিখুঁত দাঁত কিংবা অতিরিক্ত ফোকাসড চোখ ইত্যাদি লক্ষণ এই ধরণের কনটেন্টের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
রিভার্স ইমেজ সার্চ ব্যবহার করুন
আপনি যদি নিশ্চিত না হন কোনো ছবি আসল না এআই-জেনারেটেড, তাহলে রিভার্স ইমেজ সার্চ ব্যবহার করে দেখুন ছবিটি আগে কোথাও প্রকাশিত হয়েছে কিনা। সাধারণত এআই দ্বারা তৈরি ছবি খুব বেশি ওয়েবসাইটে পাওয়া যায় না। বরং একটি নির্দিষ্ট সোর্স থেকেই ছড়ায়।
পটভূমির ভুল খুঁজে দেখুন
ছবির পটভূমি বিশ্লেষণ করে অনেক সময় এআই জালিয়াতি ধরা যায়। বিকৃত ল্যাম্পপোস্ট, জানালা, বারবার অনুলিপি করা বস্তু বা অসম ছায়া প্রমাণ দেয় ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি।
সোশ্যাল মিডিয়া ট্যাগ পর্যবেক্ষণ করুন
কিছু সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, যেমন Instagram, এখন এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট চিহ্নিত করার জন্য বিশেষ ট্যাগ ব্যবহার করে। তবে এটি সব সময় নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ সফটওয়্যার দ্বারা পরিবর্তিত ছবি বা ভিডিওও অনেক সময় এআই লেবেল পায়।
ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করুন
ভিডিওতে অন্যান্য মানুষের অপ্রতিক্রিয়াশীল আচরণও হতে পারে একটি ইঙ্গিত যে তা আসল নয়। যেমন, কেউ যদি বিমানে বসে থাকা ক্যাঙ্গারুর পাশেই থাকে, তবে স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যে চমক বা প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে, যা এসব ভিডিওতে থাকে না।
বিশ্বস্ত সূত্র যাচাই করুন
ছবিটি বা ভিডিওটি কোথায় প্রকাশিত হয়েছে তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যম বা অফিশিয়াল সোর্স ছাড়া ছড়ানো কনটেন্টের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির কারণে এই প্রযুক্তিকে ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হলেও, এর অপব্যবহার থেকেও সাবধান থাকা জরুরি। প্রতারণা ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর ক্ষেত্রে এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে সচেতনতা, বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রযুক্তি-নির্ভর যাচাই কৌশল আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।




