হামাস, গাজা, ইসরাইল, নেতানিয়াহু, হামাসের গেরিলা যুদ্ধ কৌশল, হামাস যোদ্ধা

হামাসের গেরিলা যুদ্ধ কৌশল ও কূটনৈতিক চাপের মুখে সৈন্য প্রত্যাহার করতে হতে পারে ইসরাইলের

ইসরাইলি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইয়াল ওফার গাজায় চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হামাসের কৌশলগত অগ্রগতির বিষয়ে মারিভ সংবাদপত্রকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখযোগ্য মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, হামাস এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে ইসরাইলের সঙ্গে নতুন কোনো বন্দী বিনিময় বা যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলে তা কার্যত গাজা উপত্যকার মোরাগ অক্ষ ও রাফাহ শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের দিকে নিয়ে যাবে। এই এলাকাগুলোকে তিনি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

ওফার হামাসের অর্জিত ‘দ্বৈত কৌশলগত সাফল্য‘ তুলে ধরে বলেন, আন্দোলনটি একদিকে বেসামরিক জনগণের মধ্যে একীভূত হয়ে গেরিলা যুদ্ধ কৌশলের মাধ্যমে ময়দানে নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেছে এবং অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতির পর আলোচনার প্রক্রিয়া চালিয়ে ইসরাইলের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য ছাড় আদায় করতে সক্ষম হয়েছে – তাও কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি ছাড়াই।

বিশেষজ্ঞ ওফার বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির চার মাস পার হয়ে গেছে এবং হামাস এখনও কঠিন শর্তে আলোচনা চালাচ্ছে, অথচ ইসরাইল ক্রমাগত ছাড় দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ইসরাইলের পূর্বঘোষিত নীতি – অর্থাৎ আলোচনা ব্যর্থ হলে আবার যুদ্ধ শুরু – তা কার্যত কোনো কৌশলগত সাফল্য বয়ে আনেনি, বরং নতুন এক অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে।

তিনি আরও বলেন, যদি বন্দী বিনিময়ের মতো নতুন কোনো চুক্তি হয়, তাহলে হামাস ইসরাইলকে অপারেশন গিডিওনের সময় দখল করা মোরাগ রোড এবং রাফাহর বেশিরভাগ এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য করবে। এ ধরনের ছাড়কে তিনি হামাসের জন্য ‘একটি বিনামূল্যের উপহার‘ বলে বর্ণনা করেন।

ওফারের মতে, ‘ইসরাইল চিরকাল গাজা শাসন করবে না‘ এই ধারণা এখন বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে। এমনকি স্থানীয় কিছু গোষ্ঠী, যারা অস্থায়ী ইসরাইলি উপস্থিতি থেকে উপকৃত হচ্ছিল, যেমন আবু শাবাব গোষ্ঠী, হামাসের প্রতিশোধের ভয়ে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা চেয়েছে বলেও তিনি জানান।

যদিও তিনি বিশ্বাস করেন, ফিলাডেলফি করিডোর – মিশর সীমান্তে অবস্থিত এলাকাটি – এই প্রত্যাহারের আওতায় আসবে না, কারণ সেখানকার ইসরাইলি উপস্থিতিকে হামাসও একপ্রকার মেনে নিয়েছে এবং এটি অর্থনৈতিকভাবে তাদের লাভবান করছে। হামাস মিশরের তুলনায় ইসরাইলি ক্রসিং দিয়ে উচ্চমানের পণ্য প্রবেশকেই বেশি পছন্দ করছে বলেও ওফার মন্তব্য করেন।

তিনি সতর্ক করেন যে, ইসরাইল এখন এক অযৌক্তিক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তাদের গাজা উপত্যকার নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির দায়িত্ব নিতে হচ্ছে, অথচ তারা কোনো গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে না। ‘হামাস তাদের শাসন করছে, ফলে আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই – হয় তাদের মাধ্যমে, না হয় কালোবাজারি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সাহায্য পাঠাতে হচ্ছে,’ বলেন তিনি।

ওফার বলেন, ইসরাইল এমনকি চুক্তিতে পৌঁছার আগেই হামাসকে সাহায্য দিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি ও মানবিক সহায়তা। তিনি একে ইসরাইলের কৌশলগত ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখেন। এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, আমেরিকান একটি কোম্পানি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় যেভাবে সাহায্য বিতরণ করছে তা ইচ্ছাকৃতভাবে সাহায্যপ্রার্থীদের লক্ষ্য করে, যার ফলে প্রতিদিন বহু মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

হামাসের টিকে থাকার রহস্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দুটি মূল কারণ তুলে ধরেন: প্রথমত, তাদের সদস্যরা বেসামরিক জনগণের মাঝে একীভূত হয়ে থাকে, ফলে ইসরাইলের জন্য তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে; দ্বিতীয়ত, তারা ইসরাইলি বাহিনীর মধ্যে বারবার হতাহতের ঘটনা ঘটাতে সক্ষম হচ্ছে, যা তাদেরকে আরব বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

ওফার বলেন, ‘হামাস প্রায় প্রতিদিনই আমাদের সৈন্যদের ক্ষতি করছে, আর একসাথে মৃত ও অনাহারে থাকা শিশুদের ছবি তৈরি করছে, যা আন্তর্জাতিক জনমতের যুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রচার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।’

তিনি মনে করেন, হামাস বর্তমানে ‘সময় কিনছে‘, কারণ তারা জানে যে তারা কোনো প্রকৃত সামরিক হুমকির মুখোমুখি নয়। ওফার নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও এই পরিস্থিতিকে দেখেন না, বরং তিনি মনে করেন, হামাস ইতোমধ্যেই ‘মহান পুরস্কার‘ জিতে নিয়েছে – তারা গাজা শহর এবং উত্তর গাজায় কয়েক লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

শেষে, তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘গিডিওন অপারেশনের মাধ্যমে কি হামাসকে তাদের দাবির থেকে সরে আসতে বাধ্য করা গেছে? তারা কি এখন এমন একটি চুক্তির জন্য ভিক্ষা করছে, যাতে কেবল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি থাকবে? মোটেও নয়।’ তার মতে, ‘বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি ক্ষয়ক্ষতির, এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের গাজা থেকে এমনভাবে বহিষ্কৃত হতে হবে, যেমন দুর্নীতিগ্রস্ত একজন বিক্রেতাকে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।’

সূত্র : মারিভ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top