বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতের পর যুক্তরাজ্যে বিলাসবহুল সম্পত্তি লেনদেন ও অর্থপাচার নিয়ে বিস্তৃত অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। ক্ষমতায় থাকার সময়ই বাংলাদেশের প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ব্যক্তিরা সরকারি চুক্তি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা বিদেশে স্থানান্তর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন বাংলাদেশ সরকার এসব পাচার রোধ ও সম্পদ ফেরত আনার লক্ষ্যে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করছে।
গার্ডিয়ান ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এক যৌথ অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয়েছে, বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে যেসব বাংলাদেশী তদন্তাধীন, তারা যুক্তরাজ্যে সম্পত্তি বিক্রি, স্থানান্তর কিংবা পুনঃঅর্থায়ন করেছেন। এতে যুক্তরাজ্যের আইন সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট পরামর্শদাতাদের নজরদারি কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় অপরাধ সংস্থা (এনসিএ), যাকে ‘ব্রিটেনের এফবিআই’ বলা হয়, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পদ জব্দ করেছে। মে মাসে এনসিএ রহমান পরিবারের ৯০ মিলিয়ন মূল্যের সম্পদ জব্দ করে। এর আগে গার্ডিয়ান পরিবারটির ওপর একটি অনুসন্ধান চালিয়েছিল। এরপর ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ১৭০ মিলিয়নের বেশি সম্পদ জব্দ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি তার মন্ত্রীকালীন সময়ে ৩০০টির বেশি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও টাউনহাউস ক্রয় করেছিলেন।
বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ব্যাংক এনসিএ-কে আরো সম্পদ জব্দে তৎপরতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছে। গভর্নর আহসান মনসুর এবং দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন উভয়েই যুক্তরাজ্যের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মনসুর বলেন, ‘সম্পত্তি জব্দের মতো পদক্ষেপ আমাদের সম্পদ ফেরত আনার সম্ভাবনা তৈরি করে।’
যুক্তরাজ্যের ভূমি রেজিস্ট্রি অনুযায়ী, তদন্তাধীন ব্যক্তিদের মালিকানাধীন অন্তত ২০টি সম্পত্তির ‘কারবারের জন্য আবেদন’ জমা পড়েছে, যেগুলোর মধ্যে কিছু বিক্রি বা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এর মধ্যে সোবহান পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন ২৪.৫ মিলিয়নের তিনটি সম্পত্তিও রয়েছে।
নাইটসব্রিজের একটি চারতলা বিলাসবহুল টাউনহাউস দুবার লেনদেন হয়েছে। এটি একসময় সায়েম সোবহান আনভীরের মালিকানাধীন ছিল, সংযুক্ত আরব আমিরাত নিবন্ধিত একটি কোম্পানির মাধ্যমে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এটি বিনামূল্যে ‘ব্রুকভিউ হাইটস লিমিটেড’-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়, যার পরিচালনায় রয়েছেন ‘অরবিস’ রিয়েল এস্টেট সংস্থার একজন পরিচালক, যিনি পূর্বে সোবহান পরিবারের হয়ে কাজ করেছেন বলে রেকর্ডে দেখা গেছে।
এই লেনদেনগুলো দুর্নীতিবিরোধী অভিযান না রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ এগুলোকে প্রয়োজনীয় জবাবদিহিতা মনে করলেও অন্যরা একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযানের অংশ হিসেবে দেখছেন। তবে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এসব বিদেশী সম্পদ পুনরুদ্ধারে ব্রিটিশ সহায়তা নিয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
যুক্তরাজ্যের ল্যান্ড রেজিস্ট্রি ও তদন্ত নথির তথ্য বলছে, বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্যরা বহু মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি লেনদেনের সাথে যুক্ত। এসব পরিবারের মধ্যে রয়েছে সোবহান, চৌধুরী ও রহমান পরিবার।
সোবহান পরিবারের একজন সদস্যের মালিকানাধীন লন্ডনের একটি বাড়ি ৭.৩৫ মিলিয়নে একটি নবগঠিত কোম্পানির কাছে বিক্রি হয়েছে, যার পরিচালক হলেন এক অনলাইন-প্রোফাইলহীন হিসাবরক্ষক। তিনি আরো একাধিক কোম্পানির পরিচালক, যেগুলো বহু মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তি লেনদেনের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
সারে’র ভার্জিনিয়া ওয়াটারে শাফিয়াত সোবহানের মালিকানাধীন ৮ মিলিয়নের একটি প্রাসাদসহ আরো দু’টি সম্পত্তি লেনদেনের বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সংস্থাগুলো অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
চৌধুরী পরিবারের আনিসুজ্জামান চৌধুরীর চারটি সম্পত্তির সাম্প্রতিক কার্যক্রমও নজরদারিতে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে রিজেন্টস পার্কের পাশের ১০ মিলিয়ন মূল্যের একটি জর্জিয়ান টাউনহাউস। যদিও তিনি সম্পত্তি জব্দের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, বাংলাদেশে একটি ব্যাংক ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে দুদককে তদন্তের অনুরোধ জানিয়েছে।
একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশী সফল ডেভেলপার, যিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্তাধীন, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশী আদালত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
এছাড়া বেক্সিমকো গ্রুপের সাথে যুক্ত সালমান এফ রহমানের ছেলে ও ভাগ্নের মালিকানাধীন সম্পত্তিগুলোর ব্যাপারেও তদন্ত চলছে। এনসিএ গত মাসে মেফেয়ারের গ্রোসভেনর স্কোয়ারে ৩৫ মিলিয়নের একটি অ্যাপার্টমেন্ট জব্দ করেছে। অভিযুক্তরা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে দুর্নীতি ও কর সংক্রান্ত সর্বদলীয় সংসদীয় দলের সভাপতি এমপি জো পাওয়েল দ্রুত তদন্ত ও সম্পদ জব্দের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘তদন্ত চলাকালীন দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সম্পদ হারিয়ে যেতে পারে।’
এই তদন্তগুলো যুক্তরাজ্যে সন্দেহজনক তহবিল ও অলিগার্কদের সম্পদ স্থানান্তর নিয়ে নতুন করে মনোযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল অর্থে গড়া যুক্তরাজ্যের বিলাসবহুল সম্পত্তি সাম্রাজ্য এখন নজরদারির কেন্দ্রে এবং ভবিষ্যতে এই তদন্তের ফলাফল এসব গোপন লেনদেনের পরিণতি নির্ধারণ করবে।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান




