ভারত, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, অপারেশন সিঁদুর, সম্পাদকের বাছাই,

ভারত অপারেশন সিঁদুরের কথা কেন ভুলতে পারছে না?

ইবনুল কালাম
গত পরশুদিন ভারতের বিমান বাহিনীর প্রধান দাবি করেছেন, তারা অপারেশন সিঁদুরের সময় সাত আটটি পাকিস্তানি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছেন। সেনাপ্রধান বলেছেন, অপারেশন সিঁদুরে ভালোমতো শিক্ষা দেইনি। তবে এবার ধরলে মানচিত্র গিলে খাব। এছাড়া কিছুদিন আগে খেলার জয়কে অপারেশন সিঁদুরের মতো জয় আখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু কেন ভারতীয়রা অপারেশন সিঁদুরের কথা ভুলতে পারছে না? এ নিয়ে কয়েকটি নোক্তা দিতে চাই।
এক.
ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে নয়াদিল্লির সবচেয়ে বড় সফলতা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ। এর মাধ্যমে ভারতের নানাবিধ ফায়দা হয়েছে। যেমন, বাংলাদেশ থেকে অনেক লুটপাট করতে পেরেছে। জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে যেসব অনুদান বাংলাদেশের জন্য এসেছে, সেসব হজম করার সুযোগ পেয়েছে। সবচেয়ে বড় লাভ ছিল- বিশ্বের চোখে ভারত উপমহাদেশের হিরো হতে পেরেছে।
কিন্তু অপারেশন সিঁদুরের মাধ্যমে ভারতের ওই অহঙ্কারের প্রাসাদ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। একদিকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র হারাতে হয়েছে; যা নতুন করে কিনতে গেলে তার ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির সাড়ে বারোটা বাজবে। অন্যদিকে আমেরিকা ও ইউরোপীয় মিত্রদের দৃষ্টিতে তার শ্রেষ্ঠত্ব মাটি হয়ে গেছে। উল্টোদিকে তুলনামূলক দুর্বল সামরিক শক্তির পাকিস্তান সবার চোখে হিরো হয়ে গেল।
এর জন্য অবশ্য ভারত অন্য কাউকে দোষ দিতে পারছে না। মোদির অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও অহমিকাই এর জন্য প্রধানভাবে দায়ী। ভারতীয় বিমান বাহিনীর উপ-প্রধান তাদের ও পাকিস্তানের সামরিক শক্তির বাস্তবতা বুঝতেন। সেজন্য তিনি এই অভিযানের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু মোদি অহঙ্কারে অন্ধ হয়ে তাকে বরখাস্ত করেন।
এছাড়া পাকিস্তানের হামলার বিষয়টি মোদি গোপন রাখতে পারেনি। হামলার দু’তিন দিন আগেই পাকিস্তান পরিকল্পনা জেনে গেছে। যে কারণে পাকিস্তান প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পেয়েছে। তাই তো দেখা গেছে, ভারতীয় হামলার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে পাল্টা আঘাত হানতে পেরেছে পাকিস্তান।
মোটকথা মোদি প্রশাসনের নানামাত্রিক ব্যর্থতায় অপারেশন সিঁদুরে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে ভারতকে।
দুই.
অপারেশন সিঁদুরে বিজয় লাভ করার পরে পাকিস্তান পশ্চিমা বিশ্বের চোখে হিরো হয়ে যায়। তাদেরকে অনেক বড় করে দেখতে থাকে মধ্যপ্রাচ্যও। যেকারণে সৌদির মতো মোদির ঘনিষ্ঠ মিত্র ন্যাটোর আদলে চুক্তি করেছে পাকিস্তানের সাথে। সে হিসেবে পাকিস্তানের সাথে মোদির চালাকির হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। এখন পাকিস্তানের দিকে চোখ তুলে তাকাতে হলে মোদিতে ভাবতে হবে, সৌদি আরবে থাকা তার শ্রমিকদের কী হবে? আরো নানামাত্রিক বিড়ম্বনা আছে তার।
আমেরিকাও এখন ভারতকে তেমন প্রয়োজন মনে করছে না। যে কারণে মোদির প্রিয় বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ভারতের সাথে শুল্কের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে উগ্র আচরণ করছে; যার প্রভাবে অভ্যন্তরীণভাবে চাপে পড়বে ভারত। এর বিপরীতে পাকিস্তানকে বড় তোয়াজ করছে ট্রাম্প। রেকর্ড ভেঙে পাক সেনাপ্রধানের সাথে মিটিং করছে। পাক-প্রধানমন্ত্রীর সাথে খাতির করছে। এসব বিষয় ভারতের অনেক অন্তর্জ্বালার কারণ।
নয়াদিল্লির জন্য আমেরিকাকে হাতের রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ টুল ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ভারত কার্যত বাংলাদেশে মিত্র শূন্য। এদিকে, বাংলাদেশ প্রশাসনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখানে ভারতকে অপাংক্তেয় করে তুলেছে। এছাড়া বাংলাদেশে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে ইতোমধ্যে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনের টোপ গেলাতে পেরেছে অন্তর্বর্তী প্রশাসনকে। যেকারণে কার্যত বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
এছাড়া চীনকে ঠেকাতে ভারত বরাবরই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অথচ এই চীন হটাও মিশনের জন্যই ভারতকে দাম দিয়েছিল আমেরিকা।
অর্থাৎ ভারতের এখন পুরো ইতিহাসটাই ব্যর্থতায় ভরপুর। নেই প্রতিবেশীদের মধ্যে প্রভাব; নেই সামরিক সফলতা। তবে কিসের তাগিদে তাকে মূল্যায়ন করতে যুক্তরাষ্ট্র?
তিন.
গোটা বিশ্ব জেনে গেছে যে ভারত কেবল ফাফরের উপর চলে। তবুও এখন এটাই তাদের শেষ ভরসা। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী খেলার মতো ইস্যুতে জেতাকে অপারেশন সিঁদুরের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। এদিকে, অপারেশন শেষ হওয়ার আট মাস পরে এসে বিমান বাহিনী প্রধান দাবি করেন যে তারা পাকিস্তানের সাত থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেন। তারা এর মাধ্যমে বিশ্বকে বুঝাতে না পারলেও তার দেশের মানুষগুলোকে বুঝাতে পারছেন। আপাতত অভ্যন্তরীণ চাপ কমানোও কম কিসের?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Scroll to Top